অঙ্গ প্রতিস্থাপন – মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকা

প্রকৃতির অন্যান্য সব প্রাণী থেকে মানুষ স্পষ্টতই অনেক উন্নত এবং এটাই হয়েছে মানুষের কাল। প্রতিদিন চোখ পড়ে অজস্র দুর্ঘটনার খবর-এসব দুর্ঘটনায় কেউ হারায় চোখ, কেউবা হারায় হাত, পা অথবা চোখ, এছাড়াও আছে বিভিন্ন রকম রোগ বালাই যার ফলে বিকল হয় কিডনী, যকৃত, হৃদপিণ্ড ইত্যাদি। অনেকের আবার আগুনে বা এসিডে ঝলসে যায় সুন্দর চেহারা। এসব সমস্যা খুব সহজেই অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক বিস্ময়কর সংযোজন অঙ্গ প্রতিস্থাপন। উন্নতবিশ্বে বিগত কয়েক বছরের কঠিন সাধনার ফলে চিকিৎসকেরা মানব দেহের প্রায় সকল অঙ্গই প্রতিস্থাপন করতে সফল হয়েছেন, এগুলোর মধ্যে – পুরো মুখমণ্ডল প্রতিস্থাপন, হাত-পা প্রতিস্থাপন, কিডনী, হার্ট, লিভার, অগ্ন্যাশয়, অন্ত্র এবং ফুসফুস উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশও এক্ষেত্রে একেবারে পিছিয়ে নেই, চোখ আর কিডনী প্রতিস্থাপন শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই, এবং অঙ্গের বিস্তৃতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই এই বিষয়ে কিছুটা ধারণা দেওয়ার জন্যই এই অবতারনা। উন্নত বিশ্বে প্রায় সব ধরনের অঙ্গ প্রতিস্থাপন সম্ভব হলেও, এইখানে আমি জনপ্রিয় এবং পরিচিত কিছু প্রতিস্থাপন নিয়ে আলোচনা করবো আর বাকিগুলা শুধু ধারণা দিব। তাহলে এগোনো যাক…

অঙ্গ প্রতিস্থাপন কি এবং কেন?

সাধারন পরিভাষায় প্রতিস্থাপন মানে কোন কিছুর স্থলে অন্যকিছু বসানো বা লাগানো, কিন্তু অঙ্গ প্রতিস্থাপন মানে বিকল বা ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গের স্থলে ভালো অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা বা বসানো। যেমন কোন অন্ধের ত্রুটিপুর্ণ চোখের স্থলে ভালো চোখ বসানো, বা বিকল কিডনীর স্থলে ভালো কিডনী বসানো। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর একটা সুন্দর নাম আছে, অর্গান ট্রান্সপ্লান্টেশন (Organ Transplantation)। যার শরীরে অঙ্গপ্রতিস্থাপন করা হবে তাকে গ্রহীতা (Recipient) বলা হয় এবং যার কাছ থেকে প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গটি নেওয়া হয় তাকে দাতা (Donor) বলা হয়।

প্রতিস্থাপন করা হয় সাধারণত কোন ক্ষতিগ্রস্ত বা বিকল অঙ্গকে পুনরায় কর্মক্ষম করার জন্য যাতে করে যার দেহে (গ্রহীতা) প্রতিস্থাপন করা হবে সেরোগ হতে আরোগ্য লাভ করে, এবং জীবন ফিরে পায়। অনেক সময় আগুনে বা এসিডে পুড়ে চেহারা নষ্ট হয়ে গেলে, আগের চেহারা ফিরিয়ে আনতে টিস্যু প্রতিস্থাপন করা হয়।

প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গের উৎস

প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গ জীবিত ও মৃত উভয় ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া যেতে পারে, তবে জীবিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান কারণ জীবিত ব্যক্তির কাছ থেকে শুধুমাত্র সেই সব অঙ্গই নেওয়া যেতে পারে যেগুলো দাতার কাছ থেকে নেওয়ার পর দাতা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেনা বা মৃত্যুর আশংকা থাকবেনা কারণ একজন জীবিত মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে আরেকজনকে বাঁচানোর কোন মানে নেই। যেমন, কিডনী বা যকৃত জীবিত ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া যায় কারণ, কিডনী একটা থাকলেও মানুষ ভালোমতো বেঁচে থাকতে পারে আবার যকৃত কিছুটা কেটে নিলেও তা আবার অল্প দিনের মধ্যেই কোষ বিভাজনের মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরে যায়। জীবিত ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপনযোগ্য চোখের ও উৎস হতে পারে। মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে মস্তিস্ক ব্যতিত প্রায় সকল অঙ্গই নেওয়া যেতে পারে।

মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে, মৃত্যুর পর দাতার দেহ থেকে অঙ্গ গুলো সংগ্রহ করাহয়। এক্ষেত্রে মৃত্যু বলতে মস্তিস্কের সকল কার্যক্ষমতা পুরোপুরি এবং চিরতরে শেষ হয়ে যাওয়া (BrainDeath) কে বুঝায়। যন্ত্রের সাহায্যে Brain Dead ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস কৃত্রিমভাবে চালু রাখা হয়। ফলে হৃদস্পন্দন অব্যাহত থাকে। এতে করে প্রতিস্থাপন যোগ্য অঙ্গগুলো অক্সিজেন সরবরাহ পায় এবং কার্যক্ষম থাকে।

বিভিন্ন প্রকার অঙ্গ প্রতিস্থাপন

টিস্যু বা অঙ্গের উৎসের উপর নির্ভর করে অঙ্গ প্রতিস্থাপনকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা যায়ঃ (১) অটোগ্রাফট (Autograft) (২) আইসোগ্রাফট (Isograft) (৩) অ্যালোগ্রাফট (Allograft); এবং (৪)জেনোগ্রাফট (Xenograft)।

অটোগ্রাফটঃ  টিস্যু যখন একই দেহের এক স্থান থেকে নিয়ে অন্যস্থানে প্রতিস্থাপন করা হয় তখন তাকে অটোগ্রাফট বলে। টিস্যু এবং সেক্স অর্গান প্রতিস্থাপন করার সময় সাধারণত অটোগ্রাফট করা হয়। দাতা ও গ্রহীতা একই ব্যক্তি হওয়ার কারণে এধরনের প্রতিস্থাপনে কোন বাধা নেই। এ ধরনের প্রতিস্থাপনের উদাহরন, মুখমন্ডল প্রতিস্থাপন ও ট্রান্সসেক্সুয়াল অপারেশন।

আইসোগ্রাফটঃ এক্ষেত্রে টিস্যু জেনেটিক দিক থেকে সাদৃশ্য ব্যক্তির দেহথেকে নেওয়া হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জমজদের মধ্যে এধরনের প্রতিস্থাপন করা হয়।জেনেটিক দিক দিয়ে একই হওয়ার কারণে এটাতেও সাধারনত কোন সমস্যা দেখা যায়না। উদাহরণ,অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন।

অ্যালোগ্রাফটঃ টিস্যু যখন একই প্রজাতির অন্য কারো থেকে নেওয়া হয় তখন এটাকে অ্যালোগ্রাফট বলা হয়। সহজ করে বললে মানুষ থেকে মানুষে, ইঁদুর থেকে ইঁদুরে অঙ্গপ্রতিস্থাপন-ই হল অ্যালোগ্রাফট। প্রতিস্থাপনের এই প্রকারটাই বেশি আমাদের চোখে পড়ে। একই প্রজাতির প্রাণীদের ভেতর জেনেটিক কিছু পরিবর্তন থাকার কারণে এধরনের প্রতিস্থাপনে কিছু বাধা দেখা যায়।

জেনোগ্রাফটঃ প্রতিস্থাপনের এই প্রকারটাই সবথেকে আশ্চর্য এবং জটিল, এইক্ষেত্রে এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে (নিকট সম্পর্কিত) অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়।তাই এখানে সাফল্য তুলনামূলক ভাবে কম। উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে ফে’রকথা। ১৯৮৪ সালে সদ্যোজাত শিশু ফে’কে অতিরিক্ত ২০ দিন বাচিয়ে রাখা গিয়েছিল একটি বেবুনের হৃৎপিন্ড সংযোজন করে।

কিছু অঙ্গের প্রতিস্থাপনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা

উন্নত বিশ্বে দেহের প্রায় সবটুকু প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে কিন্তু কিছু সমস্যার কারণে আমাদের দেশে এখনো পর্যন্ত যকৃত, কিডনী, চোখ এরবাইরে কিছু প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়নি। তাই আপাতত এইগুলা নিয়েই আলোচনা করা হল, আর বাকি গুলা সম্পর্কে পরে অল্প করে লেখা হয়েছে।

চোখ প্রতিস্থাপন (Eye Transplantation)

চোখ কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা সকলের জানা, বিশেষ করে যারা অন্ধ। চোখ অনেক কারণেই নষ্ট হতে পারে, আবার অনেকেই জন্মান্ধ হয়ে থাকেন। যখন চশমা, ড্রপ, সাধারন অপারেশন করেও চোখের দৃষ্টি ফেরানো সম্ভব হয়না, তখনই প্রয়োজন পড়ে চোখ প্রতিস্থাপনের। আমরা অনেকেই হয়তো চোখ প্রতিস্থাপন বলতে পুরা চোখটাই অন্য এক ব্যক্তির চোখের কোঠরে বসানোর কথাই ভাবি, আসলেই কি তাই! না এটা মোটেই সম্ভব নয় কারণ চোখ বসানো সম্ভব হলেও সে ব্যক্তি আসলে কিছু দেখবে না কারণ চোখ ও মস্তিস্ক এর মাঝে অনেকগুলা নার্ভ টিস্যু থাকে যার মাধ্যমে চোখ দিয়ে গৃহীত আলোক সিগন্যাল মস্তিস্কে পৌঁছায় যাতে মস্তিস্ক তা বিশ্লেষণ করে প্রতিবিম্ব তৈরি করতে পারে, এবং সেগুলা সংযুক্ত করা সম্ভব নয় তাছাড়া নার্ভ কোষের পুনর্জন্ম (Regeneration) হয়না। যাহোক অনেক বকে ফেলেছি আসল কথা বাদ দিয়ে, চোখ প্রতিস্থাপন বলতে সাধারণত কর্ণিয়া (চোখের সামনে সাদাঅংশ বাদে গোলাকার স্বচ্ছ অংশ) প্রতিস্থাপনকে বোঝায়।

প্রথমে চোখ পরীক্ষা করা হয় তারপর দাতার চোখের কর্ণিয়া গোলাকার করে কেটে নেওয়া হয় এরপর গ্রহিতার কর্ণিয়া কাটা হয়-এক্ষেত্রে আকার একই রাখাহয়। এরপর দাতার কর্ণিয়া গ্রহিতার চোখে বসিয়ে সুঁই দিয়ে সেলাই করে দেওয়া হয়। অতঃপর এন্টিবায়োটিক ড্রপ দেওয়া হয়। এভাবে রেখে দেওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে দাতার কর্ণিয়ারএন্ডোথেলিয়াল কোষ (Endothelial Cell) গ্রহিতার চোখের সাথে মিশে যায়। কর্ণিয়া (Cornea) টিস্যু বয়সের উপর নির্ভর করেনা কারণ মানুষের চোখের আকার জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একই থাকে। এছাড়া চোখের কোষ দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে স্বাধীন তাই এক্ষেত্রে যে কারো কাছ থেকে কর্ণিয়া নেওয়া যায় কোন রিজেকশান (Rejection) দেয়না।

কিডনী প্রতিস্থাপন (Kidney Transplantation)

কিডনী কি সেটা নিশ্চয় বলে দিতে হবেনা, এটি দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যাকে ছাঁকনির সাথে তুলনা করা যেতে পারে। কিডনী রক্তকে ছেকে (Filtration) বর্জ্য পদার্থগুলো মুত্রের সাথে বাইরে বের হয়ে যেতে সাহায্য করে আর দেহের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো আলাদা করে আবার রক্তের মাধ্যমে দেহে ফিরিয়ে দেয়। এই কিডনী বিভিন্ন কারণে বিকল হয়ে যেতে পারে আর ঠিক তখনি কিডনী প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

কিডনী প্রতিস্থাপনের জন্যে সবার আগে দরকার একটা ভালো কিডনী সেটা জীবিত বা মৃত ব্যক্তি উভয়ের কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে, সাধারণত ৪০ বছরের পর থেকে কিডনী দুর্বল হতে থাকে কিন্তু মানুষের মৃত্যুর পরেও এটি ব্যবহারযোগ্য থাকে। কিডনী তলপেটের নিচের দিকে প্রতিস্থাপন করা হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই পুরানো/বিকল কিডনী জোড়া দেহ থেকে বাদ দেওয়া হয়না কারণ এটা বেশ বিপজ্জনক, বরং নতুন কিডনী বা কিডনী জোড়া অন্যত্র প্রতিস্থাপন করা হয়, এক্ষেত্রে সবথেকে পছন্দনীয় স্থান হল ইলিয়াক ফসা (Iliac Fossa)। এতে করে নতুন পথে রক্ত প্রতিস্থাপিত কিডনীতে প্রবেশ করে এবং পরিশুদ্ধ হয়ে দেহে ফিরে যায়। তবে কিডনী প্রতিস্থাপনের পর দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কে রোধ করার জন্য সারা জীবন ওষুধ খেয়ে যেতে হয়।

যকৃত প্রতিস্থাপন (Liver Transplantation)

যকৃত মানব দেহের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, এটি খাদ্য হজম করতে যেমন সাহায্য করে তেমনি খাদ্য থেকে পাওয়া অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে রাখে। যকৃত বিভিন্ন কারণে নষ্ট হতে পারে, তবে প্রধানত লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis) হলে যকৃত প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। যকৃত প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো অঙ্গ থেকে ঝামেলা অনেক কম কারণ যকৃত নতুন করে জন্মাতে (Regrow) পারে আর তাই দাতার কাছ থেকে পুরা যকৃত নেয়ার প্রয়োজন হয়না,এবং জেনেটিক দিক থেকে অভিন্ন যে কারো কাছ থেকে যকৃত প্রতিস্থাপনযোগ্য কোষ নেওয়া যায়।

এক্ষেত্রে দাতার যকৃত থেকে একটা অংশ কেটে নেওয়া হয়, এরপর এটি ঠাণ্ডা লবণ পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়, এভাবে প্রায় ৮ ঘন্টা যকৃত ভালো রাখা যায়।এসময়ে রোগীর দেহে যকৃত অপসারণ করে সেখানে সংগৃহীত যকৃতটি প্রতিস্থাপন করা হয়, এরপরএটি রক্তনালিকা ও পিত্তথলির সাথে যোগ করে দেওয়া হয়। যকৃত প্রতিস্থাপন করতে প্রায় ১২ ঘন্টা লাগে। ধীরে ধীরে যকৃতটি পূর্ণাঙ্গ যকৃতে পরিনত হয়। অন্যান্য অঙ্গের মতো যকৃতেরও রিজেকশান হতে পারে তাই নিয়মিত ইম্যুনোসাপ্রেস্যান্ট ড্রাগস নিতে হয়।

অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন (Bonemarrow Transplantation)

অস্থিমজ্জা হলো হাড়ের ভিতর থাকা এক ধরনের নরম টিস্যু যা রক্তকণিকা তৈরি করে এবং দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।তাই এই অস্থিমজ্জা মানব দেহের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটি বিভিন্ন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে নতুন অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন হয়। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন তিন উপায়ে করা যায়ঃ

  1. অটোলোগাস (Autologous) – রোগীর নিজের দেহের অন্য হাড় থেকে মজ্জা নেওয়া হয়;
  2. অ্যালোজেনিক (Allogenic) – রোগীর ভাই, বোন অথবা নিকট আত্মীয় থেকে মজ্জা নেওয়া হয়;
  3. সিনজেনিক (Syngenic) – রোগীর জমজ ভাই/বোন থেকে মজ্জা নেওয়া হয়।

অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের আগে রোগীর দেহে কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপি দিয়ে অস্থিমজ্জা বিনষ্ট করা হয়, এবং সেখানে নতুন মজ্জা প্রবেশ করানোহয়। অস্থিমজ্জা প্রবেশের জন্য কোন কাটাকুটির দরকার হয়না, টিউব দিয়ে সরাসরি ঢুকানো হয়, অনেকটা রক্ত দেওয়ার মতো। প্রতিস্থাপনের পর বেশ কিছু দিন বাইরে থেকে রক্ত দেওয়া লাগে এবং নিয়মিত ইম্যুনোসাপ্রেস্যান্ট ড্রাগস (Immunosuppressant Drugs) খেতে হয়।

মুখমন্ডল প্রতিস্থাপন

অবাক হলেও সত্য এ পর্যন্ত সফলভাবে অনেকের সম্পুর্ন মুখমন্ডল প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আগুনে পুড়ে বা এক্সিডেন্ট করে চেহারা একেবারে বিকৃত হয়ে গেলে মুখের উপরিভাগের পুরো চামড়া তুলে হাড়ের উপর নতুন করে চামড়া লাগানো হয়, নতুন করে পুনর্গঠন করা হয়, চোখ,নাক, মুখ সবকিছু। এক্ষেত্রে চামড়া দেহের অন্য অংশ থেকে নেওয়া হয়, নাহলে রিজেকশান দেওয়ার প্রবল সম্ভবনা থাকে। তবুও এসব রোগীদের সারাজীবন ধরে ওষুধ খেতে হয়। নিচে এমন কিছু ছবি দিচ্ছি, দেখতে ইচ্ছে করবেনা জানি, তবুও চোখের ফাক দিয়ে দেখুন।

অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও কিছু সমস্যা

লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে দেহের সাথে সম্পর্কিত নয় এমন কোন কিছু (এগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যান্টিজেন বলে) অনুপ্রবেশ করা মাত্রই দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটার বিরুদ্ধে কাজ করে এবং সেটাকে নিস্ক্রিয় করার চেষ্টা করে বা বিকল করার চেষ্টা করে, যেমনটি হয় ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দেহে প্রবেশ করলে। যাহোক অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়না কারণ প্রতিস্থাপিত অঙ্গও বৃহৎ স্কেলে অ্যান্টিজেন (Antigen) হিসাবে কাজ করে এবং প্রতিস্থাপিত অঙ্গ যদি রোগীর নিজের দেহের না হয়ে অন্য কারো বা অন্য প্রাণী থেকে নেওয়া হয়, তাহলে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চায় প্রতিস্থাপিত অঙ্গকে বিকল করে দিতে, এই ঘটনাকে বিজ্ঞানের ভাষায় রিজেকশান (Rejection) বলে। রিজেকশান সাধারণত হয় ক্রোমোজোমে অবস্থিত কিছু নির্দিষ্ট জিনের (MHC gene) ভিন্নতার কারণে, বিষয়টা এমন যে দাতার দেওয়া প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গের সাথে গ্রহিতার দেহের জিনের মধ্যে যত বেশি অমিল থাকবে রিজেকশান তত বেশি প্রকট হবে। তাই অটোগ্রাফটের (Autograft) ক্ষেত্রে সবথেকে কম এবং জেনোগ্রাফটের (Xenograft) ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি রিজেকশান দেখা যায়।

বিজ্ঞান আজন্ম পোড়া কপাল নিয়ে এসেছে এই পৃথিবীতে,বিজ্ঞান যেখানে সমস্যা সেখানে আছেই। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রতিস্থাপনে সমস্যাটা যেন একটু বেশিই প্রকট। নৈতিকতার ব্যাপার তো আছেই, মানে এখানে এক মানুষের অঙ্গ অন্য জন ব্যবহার করবে এটাতে তেমন সমস্যা নাই কিন্তু অনেক সময় অন্যান্য প্রাণী থেকেও অঙ্গ নেওয়া হয় ফলে মানুষ আর অন্য প্রাণীর মধ্যে যে তফাৎ আছে সেটা দিন দিন কমে যাচ্ছে, এখানেই মুল সমস্যা। এরপর আছে ধর্মীয় সমস্যা, যেমন ইসলাম ধর্মে অঙ্গ দান বা প্রতিস্থাপন সম্পূর্ণ হারাম কারণ হিসাবে বলা হয়, বলা হয়ে থাকে যে, মানব দেহের সব কিছুর মালিক আল্লাহ তাই তার অনুমতি ব্যতিত এইসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাওকে দান করা যাবেনা। এছাড়াও আছে মানুষের এক বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, যেমন অনেকে টাকার লোভে অবৈধ উপায়ে প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গ সংগ্রহ করছে,মানুষ খুন করতেও দ্বিধা করছে না। সব মিলিয়ে প্রতিস্থাপন এখনো অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

অসম্ভাবনার সীমানায় সম্ভাবনার হাতছানি

পাঠকদের এই বেলায় বলে রাখি, একটু চোখটা রগড়ে নিন, নইলে হটাৎ করেই চোখ কপালে উঠে যেতে পারে। না, ভয় পাওয়ার কিছু নাই – আসলে একই সাথে মজার,আশ্চর্য এবং অবিশ্বাস্যকর কিছু ঘটনা নিয়ে আলোচনা করব এই পর্বে। ত্বক, চোখ, কিডনী,লিভার, হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন শুরু হয়েছে অনেক আগেই, সম্প্রতি জেন্ডার পরিবর্তনও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। জেন্ডার বা লিঙ্গ পরিবর্তনের (Transsexualism) কথা কেউ শুনেছেন কিনা জানিনা কিন্তু এটা এখন বেশ কিছু দেশে সম্ভব, এটাও একধরনের প্রতিস্থাপন। লিঙ্গ প্রতিস্থাপন দুই প্রকারঃ (১) ছেলে থেকে মেয়েতে রূপান্তর (২) মেয়ে থেকে ছেলেতে রূপান্তর। প্রথমটা বেশ সহজ, এক্ষেত্রে পেনিস কেটে যোনী তৈরি করা হয়, গ্লান্স পেনিস দিয়ে ভগাঙ্কুর এবং পেনিসের চামড়া যোনী গহ্বর (Vaginal Cavity) এবং অন্ডকোষের চামড়া দিয়ে লেবিয়া মেজরা এবং মাইনোরা গঠনকরা হয় এবং হরমোন প্রয়োগ করে স্তন বৃদ্ধি, কণ্ঠস্বর মেয়েলি করা হয় এবং আচারনে মেয়েলি বৈশিষ্ট আনা হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পরিবর্তন করাটা একটু জটিল, এক্ষেত্রে সাধারণত স্তন কেটে সেটা দিয়ে টিস্যু গ্রাফটিং করে পেনিস তৈরি করা হয়। এরপর হরমোন প্রয়োগ করে কণ্ঠস্বর এবং আচারনে পুরুষালী ভাব আনা হয়।

লিঙ্গ প্রতিস্থাপন না হয় হলো কিন্তু কেমন হবে যদি মস্তিস্ক বাপুরা মাথাটাই প্রতিস্থাপন করা হয়! হ্যাঁ, এটাও করা হয়েছে তবে মানুষে না, অন্য প্রাণীতে,এক্ষেত্রে সাফল্য খুব কম এবং ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু পুরা মাথা বা মস্তিস্ক প্রতিস্থাপন করলে গ্রহিতা তার মনন, মেধা, স্মৃতির বদলে দাতার মনন, মেধা, স্মৃতি পাবে (কারণ আমরা যা দেখি বা করি সবকিছুই মস্তিস্কের নিউরোন কোষে সংরক্ষিত থাকে) যেটা কাঙ্ক্ষিত নয় (তবে এটাকে আমি মাথা বা মস্তিস্ক প্রতিস্থাপনের পরিবর্তে পুরা দেহ প্রতিস্থাপন বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করবো)। সাধারণত মৃত্যুর পর ৫ মিনিট পর্যন্ত মস্তিস্ক ভালো থাকে,তাই প্রতিস্থাপনের কাজটি দ্রুত করতে হয়। এত দ্রুত মস্তিস্কের সব কোষ জোড়া লাগানো অসম্ভব ব্যাপার, উপরন্তু মস্তিস্ক কোষের রিজেনারেশন (Regeneration) ক্ষমতা নেই বললেই চলে ফলে সদ্য লাগানো জোড়া গুলো বেশীরভাগই অকার্যকর হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে একটা সুবিধাই আছে যে, মস্তিস্ক প্রতিস্থাপনে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোন মাথা ব্যথা নেই।

ড. হোয়াইট ২০০১ সালে একটি রেসাস বানরের মাথা আরেকটি রেসাস বানরের মাথায় প্রতিস্থাপন করেন, এতে করে বানরটি দর্শন ও স্বাদানুভুতি ফিরে পেলেও খুব সামান্য সময়ই বেঁচে থাকে, এরপরে আরো অনেক গবেষণা হয়েছে ইঁদুর, কুকুর ইত্যাদি নিয়ে কিন্তু চিকিৎসা জটিলতা ও নৈতিকতার সাথে সম্পর্কিত কিছু ব্যাপার কারণে সমস্যাথাকার কারণে মানুষে এটা করা হয়নি।

শেষকথা

অঙ্গ-প্রতিস্থাপন নিঃসন্দেহে আশ্চর্য এক সৃজনশীল বিজ্ঞান যা মৃত্যুর পথযাত্রীকে জোগায় বেঁচে থাকার আশা, অন্ধকে দেখায় আলো। এটাকে অনিন্দ্য সুন্দর একশিল্প বললেও বিন্দুমাত্র ভুল হয়না। প্রতিস্থাপন মানুষকে দিয়েছে অপার সম্ভাবনা যখনতার আর কিছু করার নেই। এটা হয়ত জীন থেরাপির মতো বংশানুক্রমিক (Inheritable) বা স্থায়ী সমাধান নয় কিন্তু এক জীবনে এর থেকে বেশি কিছু কি চাই! তবে সম্প্রতি প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গের অভাব ঘোচাতে বিভিন্ন রকম বায়োনিক অর্গান তৈরি হচ্ছে যেগুলো রক্ত-মাংশের দেহে সরাসরি লাগানো যায়, যেমন বায়োনিক চোখ, কিডনী ইত্যাদি। তাই অচিরেই ঘটে যেতে পারে এক বিপ্লব। বিভিন্ন কারণে অঙ্গ-প্রতিস্থাপন আমাদের দেশে এখনো আতুর ঘর ছাড়তে পারেনি এটা বলা বাহুল্য। তবে এটার প্রসার বাড়ানো উচিত কারণ বেঁচে থাকাটা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, এবং এটি সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই সম্ভব। মানুষকে প্রকৃতি অনন্তকাল বেঁচে থাকার ক্ষমতা দেয়নি সত্য কিন্তু মানুষ কে দিয়েছে প্রতিস্থাপনের মতো এক সৃজনশীল ক্ষমতা যার মাধ্যমে মরেও বেঁচে থাকা যায় অন্য কারো মাঝে, তাইতো জীবন ও মৃত্যুর মাঝের দেয়ালটা দিন দিন হয়ে যায় মলিন।

তথ্যসুত্রঃ


Male, D., Roitt, I., Brostoff,J., Roth, D. (1985) Immunology. 7th Edition. Canada: ElsevierLimited. ISBN: 9870323033992.

William, E., Paul (2003)Fundamental Immunology. 5th Edition. Lippincott Williams &Wilkins Publishers.

Liver transplantation.Web: http://en.wikipedia.org/wiki/Liver_transplantation. [Viewed on: 24.09.14]

Kidney transplantation.Web: http://en.wikipedia.org/wiki/Kidney_transplantation. [Viewed on: 24.09.14]

Head transplant. Web: http://en.wikipedia.org/wiki/Head_transplant. [Viewed on: 24.09.14]

Bone Marrow Transplantation.Web:http://www.cancer.gov/cancertopics/factsheet/Therapy/bone-marrow-transplant. [Viewed on: 25.09.14]

Corneal Transplantation. Web: http://en.wikipedia.org/wiki/Corneal_transplantation. [Viewed on: 25.09.14]

Organ Transplantation.Web: http://en.wikipedia.org/wiki/Organ_transplantation. [Viewed on: 20.09.14]

Advertisements

8 thoughts on “অঙ্গ প্রতিস্থাপন – মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকা

  1. Pingback: রুপান্তরকামীতা কি মানসিক অসুস্থতা! | এইপ'স ব্লগ

  2. হাত প্র‌তিস্থাপ‌নের জন্য কত টাকা লাগবে ? এবং কোন দে‌শে প্র‌তিস্থাপন কর‌লে ভা‌লো হ‌বে?

    Like

  3. হরমোন ঔষধ টা কি বাংলাদেশে পাওয়া যাবে? পুরুষ হরমোন ।

    Like

    • সম্ভবত পাওয়া যায়, একটু ডাক্তারখানায় খোজ নিন, কারন এদেশে অনেক মেয়েরই গোফ-দাড়ি গজানো বন্ধে হরমোন ইউজ করেছে এমন শুনেছি। সুতরাং ছেলেদের জন্যেও এমন পাওয়া যাবে অথবা অর্ডার দিয়ে আনা যাবে বলেই মনে করি। 🙂

      Like

  4. চোখ প্রতিস্থাপন করতে কেমন টাকা লাগতে পারে,,,,
    আর বাংলাদেশে সম্ভব?

    Like

    • দেখুন আমি ডাক্তার নই। এসবের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া ভালো। শুধু এটুকু বলতে পারি, চোখ প্রতিস্থাপন বাংলাদেশে সম্ভব অনেক আগে থেকেই।

      Like

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s