সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ও মানসিক অভ্যস্ততা!

২০১৫ সালটা বড়ই বিষাদময়, এমন যদি হত যে ২০১৪ সালের পরে ২০১৬ সাল শুরু হতো! তাহলে হয়তো ইতিহাস একটা বড়সড় কলঙ্ক থেকে বেঁচে যেত। এই বছরটা এখনো অর্ধেক পেরোয়নি তাতেই আমরা হারিয়েছি ফেলেছি অনেক কিছু, জানিনা এই বাংলাস্থানে আর কতকিছু হারাতে হবে। এ বছরের প্রথম এবং বড় ধাক্কাটা খেয়েছিলাম ফেব্রুয়ারিতে অভিজিৎ দাদার মৃত্যুতে। এরপর থেকে ঘটনা চলমান, এফবিআই এলো দেশে আশায় বুক বাধলাম যে কিছু একটা হবেই। বিচারতো ধুর ছাই শেষে ইজ্জত নিয়ে টানাটানি। এদেশে জীবনের থেকে বিশ্বাসের মূল্য অনেক বেশি তাইতো কারো মৃত্যুর পর সবকিছু রেখে আগে দেখা হয় তার বিশ্বাস ছিল কিনা! যাহোক, অপরাধীদের ট্রেস করা যায়নি এই নিছক অজুহাতে ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়া হলো আর হত্যাকারীদের নীরব বাহবা দেওয়া হলো। এরপর হত্যা করা হলো ওয়াশিকুর বাবুকে; তবে এবার অপরাধীরা হাতেনাতে ধরা পড়ল ভাবলাম এবার কিইবা অজুহাত দিবে, কিছু একটা নাহয়ে পারেনা। যখন তাদেরও বিচার করা হয়নি তখন এদেশে অপরাধীদের বিচারের আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।

প্রথমে অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে মারা হলো, তারপর ওয়াশিকুর বাবুকে মারা হলো, অতঃপর অনন্ত বিজয়। তারপর অনেকদিন বিরতি, কি কারণে জানিনা (তাদের দয়া হয়তো!)। এদেশে এখন মানুষের বেঁচে থাকাটা তাদের দয়ার উপরে নির্ভর করে, ঈশ্বরের দয়ার উপরে নয়। কি জানি তারা হয়তো ধর্মীয় বিবর্তনের একটু উপরের ধাপে উঠে নিজেদেরকেই ঈশ্বর ভাবা শুরু করেছে! এখন আবার নৃশংসভাবে পিটিয়ে, বীভৎসভাবে জখম করে, চোখ উপড়িয়ে মারার ট্রাডিশান চলে এসেছে জানিনা এটাও বা কয়দিন চলবে। কিছুদিন আগে সিলেটে মিথ্যা চুরির অপরাধে রাজন নামের এক শিশুকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হলো – মিডিয়াবুক, ফেইসবুক, রিয়ালবুক সবখানেই তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল। প্রশাসনের তৎপরতা দেখে ভেবেছিলাম এবার বোধহয় অন্তত একটা বিচার পাবো কিন্তু যেই লাউ সেই কদু।

এভাবে চলছে আমাদের প্রশাসন, বিচারহীনতায় ভুগছে জনগন আর দৌরাত্ম বাড়ছে অপরাধীদের। এই বিচারহীনতার মাশুল দিল রাকিব নামের খুলনার একটি শিশু। তার অপরাধ সে অন্যখানে কাজ নিয়েছে, এজন্য তার পশ্চাৎদেশ দিয়ে কমপ্রেসড বাতাস ঢুকিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। তারা মানুষকে পোকামাকড়ের মত ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। যেন পোকামাকড়ের জীবন, মারলেই বা কি! ভাবতেই গা শিওরে উঠছে! রাজন বা রাকিবের বয়স অনেক কম তাই জীবনে খুব বেশি কিছু দেখতে হয়তো পারেনি কিন্তু ভয়ার্ত চোখে এই পৃথিবীর মানুষদের বীভৎস রুপ ও কুৎসিত উল্লাস দেখেছে। রাজনের হত্যার নিয়ে তোলপাড় হওয়ার প্রধান কারণ সেই নির্যাতনের ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, রাকিবের ভাগ্যটা অতটা সুপ্রসন্ন ছিলনা, নাহলে বিচার না দিতে পারলেও অন্তত তীব্র ঘৃনা দিতাম ঐসব নরপিশাচদের, এই ছাড়া তো আমাদের কিছু দেওয়ার ক্ষমতা নাই তাকে। রাজন হত্যার যে ভিডিওটা অনলাইনে প্রকাশ করা হয়েছিল, সেটা দেখার জন্য দুইবার করে ইউটিউব লিংকে গেলেও সাহস হয়নি চালিয়ে দেখার, ফিরে এসেছি। রাজন হত্যা নিয়ে প্রশাসন খুব তাড়াহুড়া করেছিলো, দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল হবে, এই করবে সেই করবে – ঠিক যেমনটি করেছিল অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর কিন্তু দুর্ভাগ্য যে কিছুই হয়নি। তবে রাজন বা রাকিব হত্যাকারীদের ভাগ্যে কি আছে সেটা বোধহয় আমরা সবাই জানি। ফলাফল আমরা জেনে গেছি সেই কলঙ্কিত বইমেলা থেকেই।

রাজনকে নিয়ে আমরা যতটা ক্ষোভের জন্ম দিতে পেরেছিলাম, তার সিকি ভাগও রাকিবের কপালে জোটেনি কারণ আমরা বড়ই অভ্যস্ত এবং ক্লান্ত। আমাদের অভ্যস্ততার শুরু হয়েছে সেই কলঙ্কিত বইমেলা থেকে (বইমেলায় লেখককে কুপিয়ে হত্যার থেকে বড় কলঙ্ক আর কি হতে পারে!)। সবাই জানে এদেশে কোন বিচার হবেনা। আসলে অপরাধ কখনোই বন্ধ হয়না যখন দেশের বিচার ব্যবস্থা অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারেন। অপরাধীরা ভাবে কই কিছু হলো না তো! হাতি ঘোড়া গেল তল, পিঁপড়া বলে কত জল, ব্যাপারটা অনেকটা এমনই তাদের কাছে। তারা জানে এদেশের মানুষ এখন এতেই অভ্যস্ত শুধু কিছুদিন একটু ব্যাপারটা জিইয়ে রাখতে পারলেই মামলা ডিসমিস। এভাবেই আমরা এক ভয়ংকর অভ্যস্ততায় নিজেদের এলিয়ে দিয়েছি। বর্তমান সময়ের কালচার হচ্ছে, কিছু হলে প্রথমে ফেসবুক খুলে একটা বিরাট বিষাদময় জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস প্রসব করা এবং কিছুক্ষণ পরপর কত লাইক পড়লো সেটা চেক করা। লাইক পাওয়া শেষ, গল্পটাও শেষ আবার নতুন গল্পের শুরু। কি ভয়ংকর কুৎসিত প্রাণী হয়ে উঠছি আমরা! বীভৎস, জঘন্য ও নৃশংসতার মধ্যেও সুখের চাবিকাঠি খুঁজে পাচ্ছি আমরা। কারো জীবনের থেকে ফেইসবুকে লাইক কামানোটাই এখন আমাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এতে শুধু ঐ নরপিশাচদের দোষ দিবনা আমি, দোষ আমাদেরও কম নয় বৈকি। আমাদের সীমাবদ্ধতাও অনেক কারণ আমরা সামাজিক প্রাণী তাই নিজের ইচ্ছে মত যাচ্ছেতাই করতে পারিনা। অভিজিৎ দাদা মারা যাওয়ার পর একটু বেশিই লেখালিখি করে ফেলেছিলাম, অনেকের সাথে বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েছিলাম, ছোটখাটো হুমকিও খেয়েছিলাম। সর্বপ্রথম হুমকি খেয়েছিলাম মামা ও বাবার কাছ থেকে, তাদের দুঃচিন্তার কারণটা স্পষ্ট কিন্তু মনের বিপরীতে গিয়ে কিছু করাটা আমার ধাতে নেই। নিজের অর্জিত জ্ঞান,  মেধা,  মনন,  বিবেক কে এক মুহূর্তেই মিথ্যা ও অসত্যের বানী দিয়ে ঢেকে দিতে পারিনা আমি; কিন্তু নিজের বিশ্বাস আগ্রহকে প্রকাশ করে নিজের কাছের মানুষগুলোকে কস্ট দেই বা কেমন করে! তাই নিতান্ত বাধ্য হয়েই সেগুলো মুছে দিতে হয়েছিল। তারপর অনেকটা চুপ করে গেলাম – চুপ করে আমি যাইনি শুধু মুখ বন্ধ রেখে ছিলাম মাত্র। কি আর করা, আমিও যে এক অতি সাধারন মানুষ যার মাথার দাম হতে পারে কারো একটি কথার সমান।

দেশে এখন কত নৃশংস ভাবে মানুষকে হত্যা করা যায় তার সুপার-রিয়্যালিটি শো চলছে। সিজন ১ শুরু হয়েছিল ব্লগার হত্যা দিয়ে, এখন চলছে সিজন ২ পিটিয়ে ও নির্যাতন করে হত্যা। রাজনকে দিয়ে শুরু হয়ে চলতেই আছে জানিনা কবে এই পর্ব কবে শেষ হবে। এদেশে আবার কোন ঘটনা একবার জনপ্রিয়তা পেলে (সে যত জঘন্য কাজই হোক) তার চেইন-বিক্রিয়া শুরু হয়। ব্লগার হত্যার পর থেকে শুধু ব্লগার হত্যার নিউজ হয়, ইমাম কতৃক শিশু কন্যা ধর্ষনের পর থেকে শুধু এ ধরনের সংবাদই আসতে থাকে। আমাদের সংবাদপত্র ও মিডিয়া গুলো এসব খবর খুব ফলাও করে প্রচার করে কারণ এতে অনেক লাভ তাদের। অনলাইন আর অফলাইন সবখানেই তাদের লাভ। তাই একবার কোন ঘটনা খুব আলোচনায় এলে, এরকম খবর আসতেই থাকে। বোধহয়, সাংবাদিকদের বলে দেওয়া হয় যে এ ধরনের সংবাদ বেশি বেশি খুঁজে বের করো। হ্যাঁ, খবর খুঁজে বের করা ভালো বটে কিন্তু আগে নয়, এখন কেন! তাহলে কি এই প্রথম এরকম ঘটছে! তা মোটেই নয়, এসব ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে, আমরা দেখেও দেখিনা। যখন নিউজ পেপারগুলো তাদের লাভটা বুঝতে পারে এসব নিয়ে চেইন-নিউজ হতে থাকে এবং আশ্চর্যজনক ভাবে কিছুদিনের মধ্যেই এই ব্যাপারে মিডিয়া একেবারে চুপ হয়ে যায়। ঠিক ফেইসবুকের মত, যেন কিছুই হয়নি! অপরাধীদের শাস্তি হলো কি হলোনা এই নিয়ে আর কোনো খবর পাওয়া যায়না বা মিডিয়াও বোধহয় এই ব্যাপারে কোন তালাশ করেনা। বড় অদ্ভুত জাতি আমরা বটে! আমরা মানুষ হতে পারিনি সত্য তবে পাকা ব্যাবসায়ী হয়েছি বটে, হত্যা, ধর্ষন নিয়েও আমরা আজকাল ব্যবসা করি।

বিবর্তনের মধ্য দিয়ে কোটি কোটি বছর ধরে আমরা আজ এই অবস্থায় পৌছেছি তাই অনেক ধরনের হিংস্রতার সাক্ষ্য আমাদের জিনে গেথে আছে। জীন সাফ্লিংয়ের মাধ্যমে এগুলো কি আবার সামনে চলে আসছে! রাজনকে পিটিয়ে মারার সময় এসব পশুদের উল্লাসধ্বনি থেকে এটাই মনে হয়, পৃথিবী থেকে মানুষ নামের সভ্য প্রানীদের বিলুপ্তি খুব কাছেই। থাকবে মানুষ নামধারী কিছু হিংস্র জানোয়ার। মেধা-মনন-ক্ষমতা অনেকদিক দিয়েই পরিপুর্ন বলেই আমরা মানুষ কিন্তু আমরা আজ যতটা হিংস্র ততটা কি আগের কোন ধাপে ছিলাম! নিজের প্রজাতিকে এতটা যন্ত্রনা ও কষ্ট দিয়ে কোন প্রাণী মারে বলে আমার জানা নাই। তবে কি আমরা আরো হিংস্র কোন প্রানীতে বিবর্তিত হয়ে যাচ্ছি! পশুদের হিংস্রতার একটা লেভেল থাকে কিন্তু মানুষের কোন লেভেল নাই। যে সভ্যতার আলোকে আমরা প্রাণী হয়েও মানুষ, সেই সভ্যতাকে আমরা পেছনে ফেলতে যাচ্ছি অচিরেই। সেদিন আর খুব দূরে নেই, অবাধ্য মানুষটিকে কেউ ফ্রেঞ্চফ্রাই করে খাবে আর বলবে – শালা কথা শুনছিলনা, চিবিয়ে খেয়ে নিয়েছি!

মোদ্দাকথা, এই পৃথিবীটা আমাদের সবার। একটা পিঁপড়া ও একটা মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার এখানে সমান। জীবন একটা অন ওয়ে ট্রিপ, তাই কারো মৃত্যু আমাদের কাম্য হতে পারেনা – হোক সেটা স্বাভাবিক অথবা অস্বাভাবিক। ব্লগার অভিজিৎ, বাবু, অনন্ত অথবা শিশু শ্রমিক রাজন বা রাকিবকে আমরা আর ফিরে পাবোনা এটাই বাস্তবতা কিন্তু আমরা প্রত্যেকে নিজের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করতে পারি, হাতে-কলমে প্রতিবাদ করতে পারি, যেটা অবশ্যই ফেইসবুকীয় প্রতিবাদ নয়। মনুষ্য প্রজাতি টিকিয়ে রাখার জন্য যদি আমরা মহাকাশ ভ্রমণ করতে পারি তাহলে এটুকু কেন নয়!

তথ্যসুত্রঃ


http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article931281.bdnews

http://www.bbc.com/bengali/news/2015/07/150713_mrk_teenager_killing_facebook_reactions

http://eurobd24news.com/?p=9184

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/463336

http://crimenewsbd.com/beta/?p=8304

http://news1bd.com/2015/05/13/news-14446

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s