রুপান্তরকামীতা কি মানসিক অসুস্থতা!

কিছুদিন আগে আমেরিকাতে সমকামীতাকে (Homosexuality) স্বীকৃতি দেওয়ার কারনে বাংলাদেশেও তার আঁচ এসে পৌঁছেছিল। এলজিবিটির (LGBT) রেইনবো ফ্লাগে ফেইসবুক ভরে গেছিলো। তাই বলে আবার ভাববেন না, এদেশের সবাই সমকামী বা রুপান্তরকামী। আসলে রেইনবো ফ্লাগের মধ্যামে আমেরিকার এই স্বীকৃতি দেওয়াকে সমর্থন জানিয়েছে। অভিজিৎ রায় ও আরো কিছু প্রতিভাবান লেখকের বদৌলতে বাংলাতে এখন সমকামীতার উপর লেখা আগের মত অপ্রতুল নয়। সমকামিতা নিয়ে অভিজিৎ দার লেখা “সমকামীতা” বইটাতো বাংলা একটা ল্যন্ডমার্ক বই। দারুন দারুন সব যুক্তি ও উদাহরন দিয়ে অতি সহজ ও সাবলীল করে তুলে ধরেছেন প্রতিটি বিষয়, যদিও যতটা লিখেছি, ততটা নিজেদের এগিয়ে নিতে পারিনি। তবে সমকামিতাকে নিয়ে বাংলাতে যতটা লেখা আছে, রুপান্তরকামিতা নিয়ে দেখলাম তার সিকিও নেই, এককথায় বলতে গেলে নেই। তাই ভাবলাম মানুষের সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশনের এই দিকটা নিয়েও লেখা উচিৎ। তাই আজ নিজেই লিখতে বসলাম।

এলজিবিটি ও রংধনু পতাকা

এলজিবিটি আসলে চার ধরনের সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশনের একটা সংক্ষেপিত রুপ। এল – লেজবিয়ান, জি- গে, বি- বাইসেক্সুয়াল, টি- ট্রান্সসেক্সুয়াল। এর মধ্যে লেজবিয়ান ও গে হলো সমকামিতা, বাইসেক্সুয়াল হলো উভকামিতা এবং ট্রান্সসেক্সুয়াল (Transsexual) হলো রুপান্তরকামিতা। এলজিবিটি শব্দটার ব্যবহার শুরু হয়েছে বেশ আগে থেকেই, তবে পুর্বে এটাকে শুধু এলজিবি লেখা হতো, অর্থাৎ ট্রান্সসেক্সুয়াল তখনো যুক্ত হয়নি, ১৯৮৮ সালের দিকে এটি পরিপুর্ণ রুপ নিয়ে হয় এলজিবিটি। ১৯৭৮ সালের ২৫শে জুনে সানফ্রান্সিস্কোতে অনুষ্ঠিত “গে ফ্রিডম ডে প্যারেডে” তে এলজিবিটির প্রতিক হিসেবে বিভিন্ন রঙের স্ট্রাইপ দেওয়া পতাকা উড়ানো হয় – এটাই এখন এলজিবিটির রেইনবো ফ্লাগ নামে পরিচিত।

এই পতাকার ডিজাইন করেন, গিল্বার্ট বেকার। বেকার এই পতাকায় মোট ৮টি রঙের স্ট্রাইপ ব্যবহার করেন যার প্রতিটি রঙের একটা নির্দিষ্ট অর্থ আছে। এই ৮টি রঙ হলো যথাক্রমে, গোলাপী, লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, ফিরোজা, নীল এবং বেগুনী; এবং এদের অর্থ যথাক্রমে, যৌনতা, জীবন, সুস্থতা, আলো, প্রকৃতি, শিল্প, প্রশান্তি এবং আত্মা। একবছর পর ১৯৭৯ সালে গোলাপী এবং ফিরোজা রঙ বাদ দেওয়া হয়, ফলে এখনকার এলজিবিটি পতাকার রঙ ছয়টি। এই ফ্লাগটি এখন সারাবিশ্বের এলজিবিটিদের প্রতিক বা সমর্থন হিসাবে ব্যবহার করা হয়। যাহোক, বিষমকামীতা নিয়ে লেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছিনা, সমকামিতা নিয়ে বেশ ভালই লেখালিখি হইছে, আর উভকামিতা নিয়ে আলাদা করে লেখার কিছু নাই। বাকি রইলো রুপান্তরকামিতা, সেটাই আজ আমরা দেখবো (যদিও অভিজিৎ রায় রুপান্তরকামিতা নিয়েও একটু আধটু আলোচনা রেখেছেন ইতোমধ্যে)।

রুপান্তরকামিতা ব্যাপারটা কি!

রুপান্তরকামিতা এক ধরনের বিশেষ অবস্থা যেখানে একটা মানুষ দৈহিক দিক দিয়ে মেয়ে হলেও মানষিক দিক থেকে সে পুরুষ অথবা দৈহিক দিক দিয়ে পুরুষ হলেও মানসিক দিক দিয়ে মেয়েলী হয়ে থাকেন।  আগে এটাকে মানসিক রোগ বলে ভাবা হলেও, সম্প্রতিক গবেষনায় দেখা গেছে রুপান্তরকামীতা যতটা মানসিক ভাবা হতো তার থেকে অনেকগুনে শারীরিক বা জৈবিক। একটা ব্যাপার এখানে পরিষ্কার করা দরকার, অনেকেই সেক্স এবং জেন্ডারকে গুলিয়ে ফেলেন। সেক্স হলো জন্ম থেকে প্রাপ্ত শারীরিক বৈশিষ্ট যা দেহের সাথে এবং ক্রোমোজোমের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত; অন্যদিকে, জেন্ডার হলো সম্পুর্ণ মানসিক ব্যাপার এবং এটা নির্ধারন করে একজন মানুষ নিজেকে ছেলে নাকি মেয়ে ভাববেন। আবার অনেকে জেন্ডার আইডেন্টিটি এবং সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন একসাথে গুলিয়ে ফেলেন কিন্তু দুটি ভিন্ন জিনিস। সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন একজন মানুষের অন্যজনের প্রতি শারীরিক আকর্ষনের ধরন নির্দেশ করে; অপরদিকে জেন্ডার আইডেন্টিটি নির্দেশ করে একজন মানুষ নিজেকে কি ভাবেন, অর্থাৎ তিনি নিজেকে ছেলে নাকি মেয়ে ভাবেন। সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন নির্দেশ করে কোন ব্যাক্তি কার প্রতি আকর্ষন অনুভব করেন এবং জেন্ডার আইডেন্টিটি নির্দেশ করে সে নিজে ছেলে নাকি মেয়ে। উদাহরণস্বরূপ, একটা ব্যাক্তি জেন্ডার আইডেন্টিটি ছেলে হলেও তার সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন ছেলেদের প্রতি হতে পারে সেক্ষেত্রে সে হবে সমকামী। মোদ্দাকথা, সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন তিন প্রকার হতে পারে – সমকামী, বিষমকামী এবং উভকামী; অন্যদিকে জেন্ডার আইডেন্টিটি দুই প্রকার হতে পারে – ছেলে এবং মেয়ে। ট্রান্সজেন্ডারদের ক্ষেত্রে জেন্ডার আইডেন্টিটি এবং সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন হয় পরষ্পর বিপরীত।

রুপান্তরকামিতা প্রাকৃতিক নাকি মানসিক!?

এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি কারণ বিজ্ঞানীরা এখনো একমত হতে পারেননি। তবে যত দিন গড়াচ্ছে, রুপান্তরকামীতা যে প্রাকৃতিক, এর পক্ষের পাল্লাটা দিন দিন ভারি হচ্ছে। আসলে সমকামীতার মত রুপান্তরকামীতাও এক প্রকার ভ্যারিয়েশন। আমেরিকান সাইকোলজিকাল সোসাইটির মতে, একটা মানসিক অবস্থা তখনই সমস্যা বা রোগ ধরা হয় যখন এটা অত্যান্ত বিরক্তি, উদ্বেগ এবং অক্ষমতার কারণ হয়ে ওঠে। অনেক রুপান্তরকামী তাদের জেন্ডারকে ঝামেলাপুর্ণ, উদ্বেগ, বা অক্ষমতা বলে মনে করেননা – তাই রুপান্তরকামী হওয়াটা মোটেই মানসিক অসুস্থতা নয়। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের জন্যই রুপান্তরকামীরা বেশি সমস্যা ভোগ করেন। তারা সমাজ থেকে যথেষ্ট সহযোগীতা পাননা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতেও সমস্যায় পড়েন, এমনকি অনেকে সামাজিক বৈষম্য, শারীরিক বা মানসিকভাবে লাঞ্ছনার স্বীকার হন। এসব কারনেই মূলত রুপান্তরকামীরা সমস্যা ভোগ করেন। ২০১০ সালে প্রথম দেশ হিসাবে ফ্রান্স রুপান্তরকামীতাকে মানসিক অসুস্থতার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। এরপর ২০১১ সালের দিকে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট থেকে WHO কে রুপান্তরকামীতাকে নতুন করে সঙ্গায়িত করার আহবান জানানো হয়েছে

রুপান্তরকামীতা অবশ্যই প্রাকৃতিক কারণ কেউ কাওকে রুপান্তরকামী বানাতে পারেনা, এটা গর্ভাবস্থা বা জিনের উপর নির্ভর করে। একটা ছোট্ট উদাহরন দিয়ে এটা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, ধরুন আপনি চোখের রঙ বাদামী নিয়ে জন্ম নিলেন অথবা অষুধ বা কন্ট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার করে চোখের রঙ পরিবর্তন করলেন। এখন আমার প্রশ্ন এখানে কোনটি প্রাকৃতিক আর কোনটা অকৃত্রিম! উত্তর সবার জানা। ঠিক এ কারনেই রুপান্তরকামীতা প্রাকৃতিক। এছাড়া ইচ্ছে করলেই কিন্তু রুপান্তরকামী বা লিঙ্গ পরিবর্তন করতে পারবেন না। হুট করে আপনি ছেলে থেকে মেয়ে বা মেয়ে থেকে ছেলে হতে পারবেন না কারণ লিঙ্গ পরিবর্তন করতে হলে আপনাকে অবশ্যই প্রকৃত রুপান্তরকামী হতে হবে যা জন্ম থেকেই নির্ধারিত।

রুপান্তরকামিতা কেন হয় এবং এর সমাধান কি!

রুপান্তরকামীতার জন্য একক কোন কারন পাওয়া যায়নি এখনো বরং এটা বিভিন্ন কারনে হতে পারে। অধিকাংশ গবেষক মনে করেন, জিনগত কিছু কারন, গর্ভে থাকাকালীন সময়ে হরমোনের অসামাঞ্জস্যতা এবং শৈশবের পরিবেশই রুপান্তরকামীতার কারণ হতে পারে। যেহেতু রুপান্তরকামীতা কোন রোগ নয় তাই এর কোন চিকিৎসার প্রয়োজন নাই। তবে রুপান্তরকামীদের মানসিক ও দৈহিক চাওয়াকে এক করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রকৃত রুপান্তরকামীদের সেক্স রিএসাইন্মেন্ট সার্জারি না করা পর্যন্ত তারা স্বস্তি বোধ করেনা। তবে শৈল্য চিকিৎসার মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করতে গেলে তিন ধাপে এটা করা যায়, প্রথমে সায়াকিয়াট্রিষ্ট দেখিয়ে কাউন্সেলিং নিতে হয়, এরপর হরমোন প্রয়োগ করা হয়, তারপর দেহ যদি হরমোনের প্রতি রেস্পন্সিভ হয় তাহলে সেক্স সার্জারি করা হয় (আরো জানতে এখানে দেখুন)। শুধুমাত্র প্রকৃত রুপান্তরকামীদের দেহ হরমোনের প্রতি রেসপন্স দেখায়।ইচ্ছে করলেই যেকেউ এ পদ্ধতিতে ছেলে বা মেয়ে হতে পারেনা। এদিক থেকে দেখলেও রুপান্তরকামীতাকে প্রাকৃতিক বলতে হয় কারণ প্রকৃতিই ওদের এভাবে সৃষ্টি করেছে। নিচে পুরুষ থেকে মেয়ে তৈরির অপারেশনের একটা চিত্র দেওয়া হলো।

চিত্রঃ ছেলে থেকে মেয়েতে রুপান্তরের শল্য চিকিৎসা বা সার্জারি

লিঙ্গ প্রতিস্থাপন দুই প্রকারঃ (১) ছেলে থেকে মেয়েতে রূপান্তর (২) মেয়ে থেকে ছেলেতে রূপান্তর। প্রথমটা বেশ সহজ, এক্ষেত্রে পেনিস কেটে যোনী তৈরি করা হয়, গ্লান্স পেনিস দিয়ে ভগাঙ্কুর এবং পেনিসের চামড়া যোনী গহ্বর (Vaginal Cavity) এবং অন্ডকোষের চামড়া দিয়ে লেবিয়া মেজরা এবং মাইনোরা গঠনকরা হয় এবং হরমোন প্রয়োগ করে স্তন বৃদ্ধি, কণ্ঠস্বর মেয়েলি করা হয় এবং আচারনে মেয়েলি বৈশিষ্ট আনা হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পরিবর্তন করাটা একটু জটিল, এক্ষেত্রে সাধারণত স্তন কেটে সেটা দিয়ে টিস্যু গ্রাফটিং করে পেনিস তৈরি করা হয়। এরপর হরমোন প্রয়োগ করে কণ্ঠস্বর এবং আচারনে পুরুষালী ভাব আনা হয়।

চিত্রঃ মেয়ে থেকে ছেলেতে রুপান্তরের শল্য চিকিৎসা বা সার্জারি

পৃথিবীতে অনেক বিখ্যাত মানুষই রুপান্তরকামী, যারা অত্যান্ত সফলতার সাথে ছেলে থেকে মেয়ে অথবা মেয়ে থেকে ছেলেতে রুপান্তরিত হয়েছেন। পৃথিবী বিখ্যাত ব্রাজিলিয়ান মডেল লি টি (Lea T), অভিনেতা এবং গায়ক এলেক্সিস আরকুয়েটি, অভিনেত্রী লেভারনে কক্স, বিখ্যাত লেখিকা জেনেট মক সহ আরো অনেকে।

তথ্যসুত্রঃ


আমেরিকান সাইকোলজিকাল এসোসিয়েশন, http://www.apa.org/topics/lgbt/transgender.aspx

উইকিপিডিয়া, https://en.wikipedia.org/wiki/Transsexual

র‍্যাশনাল উইকি, http://rationalwiki.org/wiki/Transsexualism

সাইকোলজি টুডে, https://www.psychologytoday.com/conditions/gender-identity-disorder

ট্রান্সসেক্সুয়ালিটি, http://www.transsexual.org/What.html

সাইন্স ডেইলি, http://www.sciencedaily.com/releases/2008/10/081030111005.htm

ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অফ ডিজিজ, http://apps.who.int/classifications/icd10/browse/2015/en#/F60-F69

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s