কোষীয় অমরত্ব থেকে ক্যান্সার

বর্তমান সময়ে ক্যান্সার (Cancer) শব্দটি অনেক পরিচিত। ক্যান্সার এক প্রকার দুরারোগ্য ব্যাধি। এখনো অব্দি ক্যান্সারের নির্ভরযোগ্য তেমন কোন চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। ক্যান্সার বিভিন্ন কারনে হতে পারে, তবে কারনে যাইহোক ক্যান্সার অবশ্যই জিনের পরিবর্তনের ফলে হয়ে থাকে তাই ক্যান্সার প্রধানত জেনেটিক রোগ (Genetic Disease)। এটা এমনই একটা রোগ যা শুধুমাত্র একটি কোষ থেকে শুরু হয়ে একটি পুরো অঙ্গ, এমনকি পুরো দেহেও ছড়িয়েও যেতে পারে। ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর হার অনেক বেশি তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এরোগ থেকে বাচার সম্ভবনা বেড়ে যায়। প্রায় ২০০ প্রকার ক্যান্সার আছে; সবগুলা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি জানতে পারেননি তবে বিজ্ঞানীরা বসে নেই। বাইরের দেশগুলোতে ক্যান্সার গবেষনার জন্য আলাদা ইন্সটিটিউট রয়েছে যেখানে বিজ্ঞানিরা নিরন্তর গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছেন। যাহোক, ক্যান্সার নিয়ে অনেকের মধ্যে ধোয়াশার কমতি নেই। অনেকেই ভেবে থাকেন ক্যান্সার ভাইরাস ঘটিত রোগ আবার অনেকেই ভেবে থাকেন এটা ছোয়াচে। আমার বিএসসি তৃতীয় বর্ষে ক্যান্সার নিয়ে পুরো একটা কোর্স (Oncology) ছিল, সেজন্য অল্পবিস্তর জানতে বাধ্য হয়েছিলাম বৈকি; আজ আমি আলোচনা করবো আসলে ক্যন্সার কি, কেন হয়, কিভাবে হয় এবং এটি ছোয়াচে কিনা আদৌ ইত্যাদি!

ক্যান্সার মূলত টিউমার (Tumor) থেকে হয়ে থাকে। টিউমার হলো কোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনের (Cell Division) ফলে উৎপন্ন কোষের স্তূপ বা সোজাকথায় মাংসের দলা। এটাকে ইংরেজিতে নিয়োপ্লাসিয়া (Neoplasia) বলে। এ ব্যাপারে পরে বিস্তারিত বলছি। টিউমার আবার প্রধানত দুই প্রকারঃ বিনাইন (Benign) এবং ম্যালিগন্যান্ট (Malignant) টিউমার। বিনাইন টিউমার আকারে ছোট, কোন ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায়না এবং এগুলো নির্দিষ্ট জায়গাতে আবদ্ধ থাকে; তাছাড়া বিনাইন টিউমার হটাৎ করেই সেরে যেতেও পারে, যেমন, আচিল বা তিল। অন্যদিকে, ম্যালিগন্যান্ট টিউমার আকারে বেশ বড় হয়, এর ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে এবং মেটাস্টাসিস (Metastasis) প্রক্রিয়ায় দেহের অন্যখানে ছড়িয়ে যেতে পারে। শুরুর দিকে চিকিৎসা নাহলে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার ক্যান্সারে মোড় নেয়। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের উদাহরন হচ্ছে ব্রেস্ট টিউমার (Breast Tumor), ব্রেইন টিউমার (Brain Tumor) ইত্যাদি।

চিত্রঃ মিউটেশন থেকে টিউমার, এবং তা থেকে ক্যান্সার তৈরি হয় এভাবে

এটা বললে ভুল হয়না যে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই ক্যান্সার। যেহেতু টিউমার থেকেই মূলত ক্যান্সার হয়ে থাকে তাই ক্যান্সার সম্পর্কে ভালোমত জানতে হলে দেহে টিউমার কিভাবে সৃষ্টি হয়ে সেটা জানা জরুরী। আমরা জানি জগতে সব প্রাণীর দেহ বিভিন্ন প্রকার অসংখ্য কোষ দ্বারা গঠিত। এই কোষগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর মারা যায়। এই পুরনো কোষগুলোর জায়গায় নতুন কোষ এসে জায়গা করে নেয়। এভাবেই আমাদের দেহের নির্দিষ্ট আকার-আকৃতি বজায় থাকে। সাধারনত একটা কোষ গড়ে ৪০-৪৫ বার বিভাজিত হয় তারপর মারা যায়। কোষের এই জন্ম-মৃত্যু কোষাভ্যান্তরের ক্রোমোজোম (Chromosome) তথা জিন (Gene) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ক্রোমোজোম গুলা সুতার মত লম্বা হয় এবং এর প্রান্তে টেলোমেয়ার (Telomere) নামক এক প্রকার ডিএনএ (DNA) থাকে। এই টেলোমেয়ারই মূলত কোষের জীবনকাল নির্ধারন করে তাই একে কোষের জৈব ঘড়ি (Biological Clock) বলা হয়। প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময়, কোষের মধ্যকার ক্রোমোজোমের ও বিভাজন ঘটে এবং এসময় টেলোমেয়ারের কিছু অংশ নষ্ট হয়; ফলে মাতৃকোষে যে পরিমান (লম্বা) টেলোমেয়ার থাকে অপত্য বা নতুন কোষের টেলোমেয়ারের পরিমান তার থেকে কম থাকে। এভাবে ভাঙতে ভাঙতে একটা সময় আসে যখন টেলোমেয়ার আর একটুও অবশিষ্ট থাকেনা, ফলে কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমোজোমের মুল অংশ ভেঙ্গে যায় এবং কোষটি মারা যায়। তাহলে ব্যাপারটা কি দাড়ালো! কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমোজোমের প্রান্ত থেকে কিছু অংশ ভেঙ্গে যায় এবং এটা রোধের জন্য ক্রোমোজোমের প্রান্তে এক ধরনের বিশেষ ডিএনএ দেওয়া থাকে, যার নাম টেলোমেয়ার কিন্তু বার বার বিভাজিত হতে হতে এক সময় টেলোমেয়ারও শেষ হয়ে যায় তখন ক্রোমোজোমের মুল অংশ ভাঙতে থাকে ফলে ওই কোষটি মারা যায়। শুধুমাত্র এভাবেই কোষের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে (Programmed Cell Death)।

চিত্রঃ ক্যান্সারের মেটাস্টাসিস ধাপ, এভাবেই বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে ক্যান্সার

তাহলে টিউমারের সাথে এর সম্পর্ক কি! আসলে টিউমার কোষগুলো একটু বিশেষ ধরনের। টিউমার কোষের স্বাভাবিক মৃত্যু নাই কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব!? আসলে টিউমার কোষগুলোও সাধারন কোষের মতই, কিন্তু বিশেষ ভুলের কারনে এরা অমরত্ব লাভ করেছে। আগেই বলেছি, কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমোজোমটাও বিভাজন হয় এবং এই সময় অনেক প্রকার ছোট বড় ভুল হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুলগুলো অটোমেটিক ঠিক হয়ে যায়, মাঝে মাঝে হয়না। এধরনের ভুলকে জীব বিজ্ঞানে মিউটেশন (Mutation) বলা হয়। যাহোক, ক্রোমোজোমে মিউটেশনের ফলে উক্ত কোষে টেলোমারেজ (Telomerase) নামক এক ধরনের প্রোটিন তথা এনজাইম (Enzyme) তৈরি হয় যা কিনা ভেঙ্গে যাওয়া টেলোমেয়ারকে ঠিক করে নিতে পারে। সুস্থ স্বাভাবিক কোষে টেলোমারেজ তৈরি হয়না তাই ভাঙতে ভাঙতে এক পর্যায়ে টেলোমেয়ার শেষ হয়ে যায় ফলে কোষের মৃত্যু ঘটে। টিউমার কোষে টেলোমারেজ উৎপন্ন হওয়ায় কোষ বিভাজনের সময় ভেঙ্গে যাওয়া টেলোমেয়ারটি আবার পুর্বের ন্যায় হয়ে যায় ফলে টেলোমেয়ার কখনো ফুরায় না তাই কোষ গুলাও মারা যায়না। যেহেতু কোন কোষ মারা যাচ্ছেনা তাহলে শরীরের ঐ জায়গায় তখন মাংস দলা বাধবে এবং ফুলে উঠবে। ভুলের পরিমান বড় হলে সেটা আর ঠিক হয়না এবং ম্যালিগন্যান্ট টিউমার সৃষ্টি করে। এই ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই ক্যান্সার। এভাবে চলতে থাকলে, টিউমার একসময় অনেক বড় হয়ে যায় এবং অঙ্গটি ফেটে যায় অতঃপর মেটাস্টাসিস নামক ধাপে চলে যায়। মেটাস্টাসিস ক্যান্সারের শেষ পর্যায়, এসময় টিউমার কোষগুলো রক্তে মিশে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে যায় এবং সেসব জায়গাতেও ক্যান্সার সৃষ্টি করে, সাধারনত মেটাস্টাসিস ধাপে চলে গেলে ক্যান্সার রোগীকে আর বাচানো যায়না।

যাহোক, ক্যান্সার কিভাবে হয় সেটাতো জানা হল কিন্তু কি কারনে হয় সেটা এখনো পরিষ্কার হয়নি। চলুন সেটা জানা যাক, এখন ক্যান্সার যেহেতু টিউমার থেকে হয় এবং টিউমার যেহেতু ক্রোমোজোমের ভুল থেকে হয় তাই আগে ভুলগুলো কেন হয় সেটা জানতে হবে। আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মি (UV Ray), রাসায়নিক পদার্থ (Alkylating or Acylating Agent, Formalin, Ethidium Bromide etc.), ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, ক্রোমোজোমের এই ভুলের জন্য দায়ী। এরা মূলত ক্রোমোজোমের থাকা ডিএনএতে (DNA) পরিবর্তন ঘটায় ফলে ক্রোমোজোমে মিউটেশন ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত তা ক্যান্সারে গড়ায়। কিছু কিছু ভাইরাসও ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী যেমন প্যাপিলোমা ভাইরাস (Human Papilloma Virus), হেপাটাইটিস ভাইরাস (Hepatitis Virus) কিন্তু এরা সরাসরি ক্যান্সারের সাথে জড়িত নয় বরং জিনের পরিবর্তনের জন্য দায়ী তাই ক্যান্সার মোটেই ছোয়াচে নয়। এছাড়া ক্যান্সার যেহেতু জিনের সাথে সরাসরি জড়িত তাই বংশে কারো ক্যান্সার থেকে থাকলে তার ক্যান্সার হওয়ার আশংকা সাধারনদের তুলনায় বেশি।

অনেক কথা বলে ফেললাম, ক্যান্সার কোষের একটা বিশেষ দিক নিয়ে ততটা আলোচনা করলাম না, সেটা হলো এই কোষগুলোর মৃত্যু নাই। নির্দিষ্ট পরিবেশ পেলে এরা আজীবন বংশবৃদ্ধি তথা বিভাজন করে যেতে পারে, যেটা অনেক সুখকর বিষয় বিজ্ঞানীদের জন্য কারন ক্যান্সার কোষ অমর (Immortal Cell) হলেও আমরা নই, অথচ ক্যান্সার কোষতো আমাদের দেহেরই একটা ক্ষুদ্র অংশ। কিছু বুঝলেন কি! না বুঝলে থাক, পরে একদিন এই নিয়ে গেজানো যাবে।

তথ্যসুত্রঃ


https://en.wikipedia.org/wiki/Cancer

https://en.wikipedia.org/wiki/Biological_immortality

http://science.howstuffworks.com/life/genetic/hayflick-limit2.htm

http://www.biooncology.com/molecular-causes-of-cancer

http://www.linktolife.mu/cancer_mechanism

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s