অসি-মসীর শক্তি পরিক্ষা ও নক্ষত্রের অপমৃত্যু!

বাংলায় একটা বহুল ব্যবহারিত প্রবাদ হলো, “অসির চেয়ে মশীর শক্তি বেশি“। এটা পাল্টিয়ে “মশীর চেয়ে অসির শক্তি বেশি” করার সময়টা বোধহয় এসে গেছে নাহলে একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র মানুষরূপী কিছু জানোয়ারের চাপাতির আঘাতে এভাবে খশে পড়তোনা। সেই নক্ষত্রটি হল আমাদের অভিজিৎ রায়, পেশায় সফটওয়ার প্রকৌশলি, বিজ্ঞান লেখক ও জাহানারা ইমাম পুরস্কার প্রাপ্ত বাংলা ব্লগ মুক্তমনার প্রতিষ্ঠাতা। অভিজিৎ রায় কে কাল রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি ছিলেন বাংলা ব্লগিং জগতের অন্যতম পথিকৃৎ এবং সকল বাংলা ব্লগারদের কাছে বড় দাদার মত। তাকে মেরেই এসব নরপিশাচরা ক্ষ্যান্ত হয়নি তার স্ত্রীকেও (বন্যা আহমেদ) মারাত্মক জখম করা হয়েছে। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা যে দাদা আর নেই। এই হত্যার তীব্র নিন্দা জানাই।

বাংলা ব্লগ জগতে বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্ত জ্ঞ্যান চর্চার ক্ষেত্রে মুক্তমনার মত ব্লগ দ্বিতীয়টি নেই। মুক্তমনার সাথে পরিচিত সেই ২০০৯ থেকে তাই উনার প্রায় সব ব্লগই আমি পড়েছি, বিশেষ করে বিজ্ঞানের উপর লেখাগুলো। কি অসাধারণ নিখুত ও ক্ষুরধার লেখা অথচ কত সহজ সাবলীল বক্তব্য – কোন বাড়তি কথার চাষ নেই। ব্লগ ছাড়াও অভিজিৎ রায়ের লেখা প্রায় সবগুলো বইও আমি পড়েছি। মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রথম জেনেছি তার লেখা থেকে। সত্যিই ওনার লেখার জুড়ি মেলা ভার। লেখার মাধ্যমে অভিজিৎ রায় সকল অপবিজ্ঞান, কুসংস্কার ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ভাইরাসের দিকে বুড়ো আঙ্গুল তুলে ছিলেন – আর এটাই তার মৃত্যুর কারন। আচ্ছা, কেউ ধর্মের বিপক্ষে যুক্তি দেখালেই কি তাকে মেরে ফেলতে হবে! কারো যুক্তির বিপক্ষে যুক্তি না দেখাতে পেরে তাকে মেরে ফেললেই কি ধর্মের জয় হয়ে যায় নাকি তার যুক্তির কাছে নিজের ধর্মকেই ছোট করা হয়!? মৌলবাদীরা বিজ্ঞানকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেও দোষ নাই কিন্তু যুক্তিবাদীরা ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেই যত দোষ কারন এটা যে ঐশীবাণী। এইসব ঐশীবাণীর বিরুদ্ধে পার্থিব প্রশ্নের উত্তরে যাদের হাতে কলমের বদলে চাপাতি ধরতে হয় – এটা তাদের লজ্জা। ঘৃণাভরে ধিক্কার জানাই তাদের।

ঠিক একই শক্তি এভাবেই ২০০৪ সালের এই সময়ে হুমায়ুন আজাদ কে থামিয়ে দিয়েছিল, ২০১৩ তে রাজীব হায়দার ও আসিফ মহিউদ্দিন, ২০১৫ তে অভিজিৎ রায় কিন্তু এভাবে আর কত? এরপর কে বলি হবে? সবথেকে বড় প্রশ্ন – এদের মেরেই কি সবকিছু চেপে রাখা যাবে! বাস্তবতা কিন্তু তা বলেনা কারন আরজ আলি, হুমায়ুন আজাদ, তসলিমা নাসরিনের বইয়ের ব্যাপক চাহিদা, আসিফ ও রাজীবের ব্লগের অগনিত পাঠক, শার্লি হেবদোর ম্যাগাজিনের বিক্রি লক্ষগুন বেড়ে যাওয়াই তার প্রমান। নিশ্চিত ভাবেই এবার অভিজিৎ রায়ের বইয়ের বিক্রি এবং পাঠক সংখ্যা বেড়ে যাবে, ধর্মীয় বিদ্বেষ সম্পর্কে জানবে অনেকে, বাড়বে অবিশ্বাসীদের সংখ্যা। পাশ্চাত্য ধর্মগুরুরা অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিল যে ধর্মের অবমাননাকারী নাস্তিকদের পাছায় আঙ্গুল দিলে তা নিজেদের মলদ্বারে গিয়েই ঠেকে। এজন্যই তারা এখন যে যার মত ধর্ম পালন করছে। এভাবে আসলে কিছু দমিয়ে রাখা যায়নি আর কখনো যায়না।

ছোট বেলায় পড়েছি, ধর্ম হল আত্মিক জীবে বিশ্বাস। বিশ্বাসের দিকে চিরকালই যুক্তি আঙ্গুল তুলেছে, তুলেই যাবে – এর অন্যথা হবেনা কখনো। চাপাতির কোপে কি সেই যুক্তিকে খন্ডন করা যাবে! যাবেনা, চাপাতির কোপে শুধু যুক্তির আধারটি পাল্টানো যাবে কিন্তু যুক্তি পদার্থ বিজ্ঞানের সুত্রের মতই অবিনশ্বর। বহুকাল আগে গ্যালিলিও দাবি করেছিলেন পৃথিবী ঘুরছে তাই তাকে চার্চ কতৃক প্রদত্ত মৃত্যু মেনে নিতে হয়েছিল কিন্তু সেজন্য পৃথিবী কি ঘোরা বন্ধ করেছে! পরবর্তিতে বরং সেটাই সঠিক প্রমানিত হয়েছে। তাই সব আঘাত সহ্য করে যুক্তি একদিন কারো না কারো মস্তিষ্কের কোন একটা নিউরনে আলোড়ন তুলবেই। এতে সন্দেহ নেই, মাঝখান থেকে আমরা হয়তো কিছু গুনীজন হারাবো।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী শেষ বিচারের দিন ইশ্বর তার ধর্ম অবমাননাকারীদের শাস্তি দিবেন, কিন্তু আজ কিছু মৌলবাদী অবিশ্বাসীদের শাস্তি দিয়ে নিজেদের কি ইশ্বরের সমতুল্য করার মত মারাত্মক অপরাধ করছে না! তারা কি শেষ বিচারের প্রতি বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছেনা! ইশ্বর মানুষ সৃস্টির পর তাকে সঠিকভাবে চালানোর জন্য ধর্মীয় বিধান দিয়েছিল। ভাবতে অবাক লাগে, সেই ধর্ম আজ মানুষের জীবনের ঊর্ধে উঠে গেছে।

উল্লেখযোগ্য ব্লগারদের মধ্যে ব্যাক্তিগতভাবে থাবা বাবা এবং ওয়াশিকুর বাবুর লেখার পক্ষে আমি নই। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই এদের লেখাগুলো একটু বেশিই আক্রমণাত্মক। আজকের প্রত্যকটা ধর্ম হাজার বছরের বিশ্বাস, যে বিশ্বাসকে বুকে ধারন করে আমাদের পুর্বপুরুষরা এতদূর এসেছেন। এই হাজার বছরের বিশ্বাসকে কখনোই তাচ্ছিল্য বা কটুক্তি মিশ্রিত কথা দিয়ে ভ্রান্ত প্রমান করা যাবেনা, বরং তাতে ক্ষোভ, হতাশা ও বিদ্বেষের জন্ম দিবে যার ফলাফল আমরা হাতেনাতে পেয়েছি, হয়তো আরো পাবো। বহুদিন ধরে চলিত কুসংস্কারকে শুধুমাত্র বিজ্ঞান এবং যুক্তির আলোকেই চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে এবং অবশ্যই পরিবর্তনের ব্যাপারটা জনসাধারনের উপর ছেড়ে দিতে হবে। ঠিক এভাবেই হারিয়ে গিয়েছে বহু কুসংস্কার আমাদের সমাজ থেকে।

অসি-মসির এই শক্তি পরীক্ষায় মসীর জয় অনিবার্য কিন্তু দুঃখের বিষয় এটাই যে আমাদের হয়তো আরো অনেক ১৪ ডিসেম্বর দেখতে হবে, অনেক নক্ষত্রের অপমৃত্যুর সাক্ষী হতে হবে। তবে একটা কথা সদা সত্য যে পরিবর্তন আসবেই। অভিজিৎ দা আমরা সত্যিই দুঃখিত যে তোমাকে অসময়ে এভাবে চলে যেতে হল কিন্তু আমরা গর্বিত কারন তুমি অল্প সময়ে শিখিয়েছ অনেক। তুমি নাই তাতে কি হয়েছে, তোমার শব্দগুলোতো অমর, কেউ কেড়ে নিতে পারবেনা। তুমি একদম ভেবোনা, তোমার রেখে যাওয়া কাজটা কেউ না কেউ ঠিকই করবে। আসলে আমরা রত্নগর্ভা হলেও সেই রত্নের দ্যুতি সহ্য করার ক্ষমতা সম্ভবত আজো আমাদের হয়নি, তাই যুক্তিবাদীর কলমের বিরুদ্ধে আজো আমাদের চাপাতি ধরতে হয়। ছিঃ ধিক্কার জানাই এইসব নরপিশাচদের। অভিজিৎ রায়ের হত্যাকারীদের অবিলম্বে ধরার এবং যথাযথ বিচারের দাবি জানাই।

বিদ্রঃ লেখাটি অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর পরদিন ফেইসবুকে পোষ্ট করা হয় এবং দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আমার একাউন্টের সাথে সাথে লেখাটিও অক্কা পায়, তাই লেখাটি এখানে সেটে রাখলুম।

তথ্যসুত্রঃ


http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article931281.bdnews

http://www.mzamin.com/details.php?mzamin=NjU1NTg=

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s