বঙ্গবন্ধু এবং শোকগাথা ১৫ই আগস্ট

১৯২০ সালের ১৭ই মার্চের এক শুভক্ষণে ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়ার শেখ লুতফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের কোল জুড়ে আলো ছড়ায় এক সদ্য ভুমিষ্ট শিশু। তখন কে জানতো, জন্মানো এই শিশুটি একদিন স্বাধীন বাংলাদেশের একছত্র অধিপতি হবে! হ্যা, আমি এদেশের তথা সমগ্র বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বলছি। যার বজ্রকন্ঠে উজ্জীবিত হয়ে ১৯৭১ সালে এদেশের লক্ষকোটি মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে নিজ অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। ফলস্বরূপ, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর নয় মাসের রক্তযুদ্ধের পর পেয়েছিলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা, আমাদের সোনার বাংলাদেশ আর বিনিময়ে আমরা দিয়েছিলাম ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পুর্বপাকিস্থানের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ইতিহাস আর মুজিবের জীবন যেন একসাথে মিলেমিশে একাকার। ৫২র ভাষা আন্দোলন, ৬৬র ছয় দফা দাবী, ৬৮র আগরতলা ষড়যন্ত্র, ৬৯র গনভ্যুত্থান, ৭১র স্বাধীনতা যুদ্ধ –  কোথায় এই ব্যক্তিটির অবদান নেই। এই দেশটির জন্ম দিতে গিয়ে তিনি হারিয়েছেন জীবনের ২৩টি মুল্যবান বছর, দিনাতপাত করেছেন কারাগারের অন্ধকারে। এভাবে কালের পরিক্রমায় এক অতি সাধারন ছাত্রনেতা থেকে অসাধারণ এক দলপতি হয়ে ওঠেন। এতো অসম্ভব আত্মত্যাগের পরেও কথা ওঠে, মুজিব না থাকলে কি দেশ স্বাধীন হতোনা!? আমি এই প্রশ্ন উত্তরে বলবো, দেশ হয়তো স্বাধীন হতো তবে সেটা বাংলাদেশ হতোনা নিশ্চিত। নেতা অনেকেই হতে পারেন, কিন্তু মুজিব হতে পারে কতজন! বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুজিবের মত নেতা হতে পারা একই সুত্রে গাথা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই বহু অসম্ভবের মধ্যে একটি সম্ভব্যতা যাকে ছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশ শুধু স্বপ্ন হয়েই থাকতো।

যে মানুষটা আমাদের একটি পুরো দেশ উপহার দিলো তাকেই কিনা এর ঠিক ৪ বছর পর মৃত্যু উপহার দিলাম, কত অভাগা জাতি আমরা! আমরা আমাদের জাতির জনককে মেরে ফেলেছি, নৃসংশভাবে হত্যা করেছি সপরিবারে। এর থেকে ঘৃন্যতম ইতিহাস আর আছে কিনা সন্দেহ। আজ স্বাধীনতার ৪৪তম বছর আর জাতির জনকের ৪০তম মৃত্যুবার্ষিকীর রাত। বড় খারাপ লাগে যখন দেখি স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমরা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করি; শহীদদের আত্মত্যাগ, মা-বোনের সম্ভ্রমকে সংখ্যার বিচারে নিয়ে আসি এবং মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করি। জাতির জনকের অবদানকে খাটো করার কারণ খুজতে মত্ত হই। সদ্য জন্ম নেয়া বাংলাদেশের বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে দাড় করাই তাকে। ছোট বেলা থেকেই শেখ মুজিবকে নিয়ে অনেক জায়গায় অনেক খারাপ বা কটু কথা শুনে এসেছি। মুজিব বাহিনীর অত্যাচারে নাকি সবাই অতিষ্ঠ ছিল, শেখ মুজিব দেশ নিয়ন্ত্রন করতে ব্যার্থ হয়েছিলেন, বাংলাদেশ নাহয়ে পাকিস্তান থাকলে বেশি ভালো হতো ইত্যাদি। এখন জানি এগুলো মূলত বঙ্গবন্ধুর অবদানকে ছোট করে অন্য কাওকে যুদ্ধের ক্রেডিট দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ ছিল মাত্র। এমনকি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল নাকি মেজর ডালিমের বউ অপহরন করেছিল, ব্যাংক ডাকতি করেছিল ইত্যাদি। মজার ব্যাপার, এই মেজর ডালিম একটা বই লেখেন পুরো শেখ পরিবারের প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে কিন্তু সেখানে তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, আমার স্ত্রীর সাথে আমাকেও একসাথে অপহরন করা হয়েছিল এবং এতে শেখ কামাল মোটেই জড়িত ছিলনা। আর শেখ কামাল যে ব্যাংক ডাকাতির সাথে জড়িত ছিলনা সেটা অনেক আগেই প্রমান হয়েছে। আসলে শেখ মুজিব কোন এক কুটপ্রবৃত্তিক জাতিকে আলো দেখিয়েছিল। বড়ই সার্থপর ও সংকীর্ণ মনের জাতি আমরা।

এটা মিথ্যা নয় যে সদ্য ভুমিষ্ঠ বাংলাদেশের অবস্থা দ্রুতই খারাপ হচ্ছিল, এবং এটাই স্বাভাবিক ছিল তৎকালীন সময় ও পরিস্থতি অনুযায়ী। সেটা শেখ মুজিব কিছুতেই নিয়ন্ত্রনে আনতে পারছিলেন না। এই বিষয়টাকে প্রাধান্য দিয়ে যারা শেখ মুজিবকে খাটো করতে চান, তাদেরকে বলি, নতুন বাংলাদেশের জন্য যেটা ভালো সেটাই করতে চেয়েছিলেন শেখ মুজিব কিন্তু এটা বোঝার দরকার সদ্য জন্মানো একটা দেশ যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি, সেখানে এরকম হতেই পারে। অধিকন্তু, বাংলাদেশের বিরোধী শক্তিরা তখনো এদেশে গেড়ে ছিলো, ঐসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্যে এদের দায়ও অস্বীকার করা যায়না। এমনতো হতেই পারে, শেখ মুজিবের পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যেই তারা এসব করেছিল। এছাড়াও আরো একটা বড় কারণ হিসাবে দেখানো হয় শেখ মুজিবের স্বজনপ্রীতি। কথাটা খুব মিথ্যা নয়, আসলে তিনি মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতেন। তিনি কখনো ভাবতে পারেননি তার কাছের লোক গুলোই ধীরে ধীরে বিষাক্ত হয়ে উঠবে আর তাকেই ছোবল দিবে।

এক অদেখা কিংবদন্তী 


মুজিব মানেই বাংলাদেশ, সাহসী এক আত্মপ্রত্যয়,

লক্ষ প্রানের আত্মত্যাগে বাঙালীর স্বপ্নজয়।

মুজিব মানেই মুক্তি, ছিনিয়ে আনা প্রাপ্য স্বাধীনতা,

পাকবাহিনীর অশেষ দুঃখগাথা।

মুজিব মানেই ভালোবাসা, দেশপ্রেমের প্রবাদ পুরুষ,

হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালি নিষ্কলুষ।

মুজিব মানেই জাতির জনক, আমার দেশের পিতা,

এই বাংলার বন্ধু তুমি জনগনের নেতা।

মুজিব মানেই বীরত্বগাথা, সাহসী নেতার প্রতিকৃতি,

হারিয়ে তোমায় পেয়েছি ১৫ আগষ্টের কাল রাত্রী।

মুজিব মানেই শোকগাথা, পিতার নিরব প্রস্থা্‌ন,

তিনি আমার অদেখা কিংবদন্তীর নাম।


আমাদের জেলাতে একটা ব্যাপারে শেখ মুজিবের উপর অনেক ক্ষোভ। তাকে নাকি কথায় কথায় সর্বকালের সেরা মানব বলা হয়! আমি জানি এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা এবং এটা মানুষের মধ্যে ধর্মকে ব্যবহার করে মুজিব বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আসল কথা হলো শেখ মুজিবুর রহমান বিবিসি জরিপে সর্বকালের সেরা বাঙালি নির্বাচিত হয়েছেন। এজন্য তাকে মাঝে মাঝে বলা হয়, সর্বকালের সেরা বঙালি অথবা হাজার বছরের সেরা বাঙালি। বস্তুত বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি জাতির জনক তথা পিতা। মজার ব্যাপার হলো, এই বিষয়টা নিয়েও ব্যাবসা করতে ছাড়েনি এদেশের দোসররা। তারা মানুষকে “জাতির পিতা” উপাধিকে বিতর্কিত করেছে। তাদের মতে মুসলিম জাতির জনক ইব্রাহীম, তাহলে শেখ মুজিব কে জাতির জনক বলায় ধর্মানুভুতিতে আঘাত করা হয়েছে। যদিও তাদের অনেকেই হয়তো জানেন না যে পাকিস্তান মুসলিম দেশ হলেও সে দেশেরও জাতির পিতা আছেন, মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ। আসলে মুসলিম কোন জাতিই নয়, এটা একটা সম্প্রদায় মাত্র। জাতি এবং ধর্ম দুটো বিষয় সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকলে হয়তো এই কথা তারা বলতোনা।

১৫ আগষ্টের শোকগাথা ইতিহাসের পেছনে দায়ী একটা ফ্যাক্টর বা গল্প সম্পর্কে না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যদিও সেই গল্পের নায়ক অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে, তবে ফুল বেগম এখনো মঞ্চ কাপিয়ে চলেছেন। ঠিক ধরেছেন, ম্যাডাম জিয়ার কথাই বলছি। তানার আবার ১৫ই আগষ্টের রাতে কেক না কাটলে সুখ হয়না। বছরের আর কোন দিন পাননি তিনি জন্মানোর। জন্মাবেন কেন, এটাতো তার কুমনোভাব চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে নিজের তৈরি জন্মদিন – এদেশের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার জন্যই তিনি প্রতিবছর এই আয়োজন করেন যদিও এটা তার জন্মদিনের অতি সাম্প্রতিক এডিশন। এরকম বহু (আনুমানিক ৫ টি) জন্মদিনের মালকিন তিনি। এবার কি হয়েছিল জানিনা, রাতে তিনি কেক কাটেননি, ভেবেছিলাম অন্তত একটু হলেও শুধরেছেন নিজেকে কিন্তু কয়লার ময়লা কখনোই যায়না। দিন পার হয়ে সন্ধ্যা হতেই শুনলাম উনি অত্যান্ত আনন্দ এবং সফলতার সাথে কেক কেটেছেন। জাতির পিতার মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশের একজন প্রধান নেত্রী হয়ে কিভাবে জন্মদিন পালন করেন, সেটা আমার মাথায় খেলেনা। দুর্ভাগ্য, উনি হয়তো জানেনা উনি কতটা মানসিক বিকারগ্রস্থ।

যাহোক, বঙ্গবন্ধু ইজ বঙ্গবন্ধু, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী। কোন পাগলের কথা-কাজ তার অবদানকে ছোট করার ক্ষমতা ধারন করেনা। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন থাকবে তার পিতা। আজকের এই দিনে পিতা তোমায় বড্ড পড়ে মনে।

তথ্যসুত্রঃ


https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%96_%E0%A6%AE%E0%A7%81%E0%A6%9C%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%B0_%E0%A6%B0%E0%A6%B9%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s