নতুন দিনের জীব বিজ্ঞান

বর্তমান সময়ে জীব বিজ্ঞানের সবথেকে আলোচিত বিষয় জৈবপ্রযুক্তি। জৈবপ্রযুক্তি এক অনন্য শিল্প যেটা গোটা মানব জাতিকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। জৈবপ্রযুক্তি জীব বিজ্ঞানের অতি অত্যাধুনিক শাখা। প্রযুক্তির সাহায্যে মানব সমাজের উন্নতিকল্পে জীব জগতকে ব্যবহার করাই জৈপ্রযুক্তির প্রধান লক্ষ্য। জৈবপ্রযুক্তিকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় সেটা এখন পরিবর্তনের সময় চলে এসেছে। জৈবপ্রযুক্তি এখন আর একতরফা মানুষের উন্নতিকল্পে ব্যবহার হচ্ছেনা বরং এটা জন্ম দিয়েছে, বায়োওয়ার, বায়ো-টেরোরিজম, বায়ো-ক্রাইম ইত্যাদি যেগুলো মানব সমাজের জন্য হুমকি।

১.

সত্যিকার অর্থে জৈবপ্রযুক্তি নতুন কিছু নয়, এটা সভ্যতার শুরু থেকেই আমাদের সাথে ছিল কিন্তু বুঝে ওঠার মত পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিলনা। এই কারনে জৈবপ্রযুক্তিকে প্রধান দুইভাগে ভাগ করা যায়ঃ সনাতন জৈবপ্রযুক্তি এবং আধুনিক জৈবপ্রযুক্তি। প্রাচীন কালে আমাদের পুর্বপুরুষরা গাঁজন প্রক্রিয়ায় মদ, দই, পনীর ইত্যাদি তৈরি করতো কিন্তু তাদের কোন ধারনাই ছিলনা গাঁজন প্রক্রিয়া ঠিক কি, কেন এবং কিভাবে হয়। পারতপক্ষে এগুলো ছিল জৈবপ্রযুক্তির কল্যান। জৈবপ্রযুক্তির এ অধ্যায়কেই সনাতন জৈবপ্রযুক্তি। সনাতন জৈবপ্রযুক্তির মূলমন্ত্র ছিল গাঁজন প্রক্রিয়া। উনবিংশ শতাব্দী বিজ্ঞান জগতে অনেক বিপ্লব এনে দিয়েছে, ১৯৫৩ সালে ডিএনএ আবিষ্কারের সাথে সাথে জীবনের মুল রহস্য উন্মোচন হল। ফলস্বরূপ বিজ্ঞানীরা রাতারাতি ঈশ্বর হয়ে উঠলো। এর ঠিক বছর ১৭ পরেই ইতিহাসে প্রথম বিজ্ঞানীরা ঈশ্বরের ভুমিকা পালন করলো। তারা তৈরি করলো এক নতুন ধরনের ব্যাকটেরিয়া যাকিনা বিধাতা সৃষ্টি ব্যাকটেরিয়া থেকেও অধিক উন্নত, এবং এই প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয় রিকম্বিন্যন্ট ডিএনএ টেকনোলোজি। মুলত রিকম্বিন্যন্ট ডিএনএর হাত ধরেই আধুনিক জৈবপ্রযুক্তির সূচনা। সোজাকথায়, রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি আবিষ্কারের পুর্বের জৈবপ্রযুক্তি হল সনাতন এবং পরের জৈবপ্রযুক্তি হলো আধুনিক জৈবপ্রযুক্তি।

চিত্রঃ জৈবপ্রযুক্তির বিভিন্ন শাখা

জৈবপ্রযুক্তি অল্পদিনে যেভাবে পাখামেলা শুরু করেছে তাতে আধুনিক জৈপ্রযুক্তি অতি শীঘ্রই জৈবপ্রযুক্তির মধ্যযুগ বলে বিবেচিত হবে। ইতোমধ্যে আমরা যেকোন জীবকে রি-ইঞ্জিনিয়ারিং করে প্রায় পুরোটাই পরিবর্তন করে দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছি। বিজ্ঞানের বয়স কত বছর? খুব বেশি হলে ১০০০ বছর। ডিএনএ আবিষ্কারের পর মাত্র ৬২ বছরে আমরা যা করেছি তাতে আগামী ১০০০ বছরে মানব জাতি কোন মাত্রায় যাবে সেটা খুব সহজেই অনুমেয়। এখান থেকে ৫০০ বছর পর, প্রানীদের মধ্যে বেসিক কোন পার্থক্য থাকবে বলে মনে হয় না। মানব সমাজে কোন রোগ থাকবেনা, কিছু বংশগতি রোগ হয়তো থাকবে কিন্তু জীন থেরাপির মাধ্যমে নিমেষেই সারানো সম্ভব হবে। হয়তো দেখা যাবে মানুষের জায়গা দখল করবে বায়োনিক রোবট। মানুষের জার্মসেল-টেলোমেয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং করে মানুষ হয়ে উঠবে অমর। রিজেনারেটিভ সায়েন্সের উন্নতির ফলে দুর্ঘটনায় কাটা অঙ্গ নতুন করে গজাবে।

২.

জিন প্রকৌশল আধুনিক জৈবপ্রযুক্তির এক বিশেষ অভিনব কলাকৌশল। জীন প্রকৌশলের মাধ্যমে মুলত জীবের ডিএনএ তে সরাসরি পরিবর্তন আনা হয়। যে প্রাণীর জিনে পরিবর্তন আনা হয় তাকে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বলা হয়। এজন্য নির্দিষ্ট কোন জিনকে মলিকিউলার কাঁচি দিয়ে কেটে জিন বাহক প্লাজমিডের সাথে যুক্ত করে দিতে হয়। এরপর উক্ত প্লাজমিড পুনরায় ব্যাকটেরিয়ার দেহে প্রবেশ করাতে হয়। তাহলে উক্ত ব্যাকটেরিয়াতে বাহক প্লাজমিডটি প্রোটিন তৈরি করার সময়, আমাদের কাঙ্ক্ষিত জিনের প্রোটিনও তৈরি হবে। এটাই মুলত জীন প্রকৌশল।

চিত্রঃ জিন প্রকৌশলের মুল প্রক্রিয়া

এক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে আলোকপাত না করলেই নয়। যেমন মলিকিউলার কাঁচি বলতে কিন্তু চুল কাটার কাঁচি নয়। এগুলো একপ্রকার উৎসেচক (Enzyme) যাকিনা নির্দিষ্ট কোন ডিএনএ অংশকে কাটে। এজন্য জিন প্রকৌশলে নির্দিষ্ট জিনকে কাটার জন্য এধরনের মলিকিউলার কাঁচি ব্যবহার করা হয়। মলিকিউলার কাঁচি দিয়ে কাটা খন্ডকে জোড়া লাগানোর জন্য মলিকিউলার আঠাও আছে, এটাও একপ্রকার উৎসেচক, নাম লাইগেজ এনজাইম। এখন কথা হলো, চোখে দেখেতো আর জিনে কাঁচি চালানো সম্ভব নয়। তাহলে নির্দিষ্ট জিনকে কাটবো কিভাবে! অথবা কাঁচি গুলো আসলে কোথায় কাটে! ডিএনএর বিভিন্ন অংশে প্যালিন্ড্রমিক অনুক্রম (Palindromic Sequence) নামে একধরনের বিশেষ কিছু জায়গা থাকে যেখানে ডিএনএর যেকোন দিক থেকে পড়লে একই রকম অনুক্রম থাকে। নিচের ছবি দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। যাইহোক, মলিকিউলার কাঁচি মুলত এইসব অনুক্রমেই কাটে। এবং একটা নির্দিষ্ট জিন কোন বাহক প্লাজমিডে যুক্ত করতে গেলে, দুটোতেই একই কাঁচি দিয়ে কাটতে হয় তাই একই প্যালিন্ড্রমিক আওনুক্রম থাকা আবশ্যক। এখন প্লাজমিড (Plasmid) নিয়ে কিছু প্যাচাল পাড়া যাক। সাধারণত প্রকৃত কোষের ডিএনএ গুলো সুত্রাকার (Linear) এবং কুন্ডুলি পাকিয়ে থাকে কিন্তু আদিকোষ বা ব্যাকটেরিয়া কোষে দুই প্রকার ডিএনএ পাওয়া যায়, তন্তুকার (Filamentous Chromatid) ও বদ্ধ-বৃত্তাকার (Closed Circular)। বৃত্তাকার এই ডিএনএ গুলো সম্পুর্ন স্বতন্ত্রভাবে কোষের মধ্যে প্রতিলিপি তৈরি করে এবং বংশবৃদ্ধির সাথে সাথে নতুন কোষে প্রবেশ করে। এই বৃত্তাকার ডিএনএ গুলোই প্লাজমিড। এদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্টই এদের জীন প্রকৌশলের জন্য উপযুক্ত করেছে।

জিন প্রকৌশল এক প্রকার ঈশ্বরের উপর মাতুব্বারি, কারণ ঈশ্বরের সৃষ্ট জীবদের মধ্যে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য জীন প্রকৌশল ব্যাবহার করা হয়। এর মাধ্যমে একটা জীব বা প্রানীকে পুরোপুরি পরিবর্তন করে ফেলা যায়। জিন প্রকৌশল করে বিভিন্ন রোগ সারানো সম্ভব হচ্ছে এখন, যেগুলো মুলত বংশগত রোগ। বংশগত রোগ একেবারে নির্মুল করতে জিন প্রকৌশলের জুড়ি নাই। জীব জগতে বিশেষ করে মনুষ্য সমাজে মায়া মমতার প্রধান উৎসই হলো নির্ভরযোগ্যতা। যেই মুহুর্তে মানুষ সবকিছুতে সয়ংসম্পুর্ন হয়ে যাবে তখন মায়া-মমতা নামক মনুষ্য অনুভুতিটার বিলুপ্তি ঘটবে পৃথিবী থেকে, সাথে সাথে মানুষ নামের প্রানীটাও। পৃথিবী হয়ে উঠবে এক অত্যাধুনিক ডিজিটাল চিড়িয়াখানা।

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s