জাঙ্ক ডিএনএ কি আসলেই জাঙ্ক!?

আমরা জানি কোন জীবের সকল বৈশিষ্ট নিয়ন্ত্রিত হয় উক্ত জীবের প্রতিটি কোষে থাকা ডিএনএ বা জীন দ্বারা। এই ডিএনএ গুলো আবার বড্ড অকর্মা, নিজেরা কোন কাজ করতে পারেনা, বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করার জন্য তারা বিভিন্ন প্রোটিন তৈরি করে। সাধারণত, একটা জীন একটা প্রোটিন তৈরি করে। এখন কথা হল, জীবকোষে থাকা সকল জীনই কি কোন না কোন প্রোটিন তৈরি করে!? মোটেই না, মানুষের মোট ডিএনএ’র মাত্র ২% প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম। তাহলে এই বিপুল পরিমান, অর্থাৎ বাকি ৯৮% ডিএনএ’র কাজ কি এবং কেনইবা আমাদের কোষে থেকে গেল – এটা একটা জটিল প্রশ্ন বটে! যেসকল ডিএনএ কোন প্রোটিন তৈরি করতে পারেনা তাদের জাঙ্ক ডিএনএ বলা হয়। উল্লেখযোগ্য জাঙ্ক ডিএনএ সমুহ হল –  ননকোডিং আরএনএ (Ribosomal RNA, Transfer RNA, MicroRNA), টেলোমেয়ার (Telomere), জীন সুইচ (Gene Switch), ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (Transcription Factors), মোবাইল ডিএনএ (Mobile DNA Elements) ইত্যাদি থাকে যা জীন থেকে প্রোটিন তৈরিতে ভুমিকা রাখে।

আসলে শুরুতে ভেবে নেওয়া হয়েছিল জীবের প্রতিটা ডিএনএ’র নির্দিষ্ট কাজ আছে। ২০০১ সালে যখন হিউম্যান জিনোম প্রোজেক্ট (Human Genome Project) শেষ হলো, তখন গবেষকরা দেখলো, মানুষের মোট জীনের মাত্র ২% জীন প্রোটিন তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, বাকি ৯৮% জিনের বলতে গেলে কোন কাজই নেই। এরপর ২০০৩ সালে এনকোড (ENCODE, Encyclopedia of DNA Elements) প্রোগাম হিউম্যান জিনোম নিয়ে ঘেটেঘুটে দেখলো, আসলে এই জাঙ্ক ডিএনএ গুলো কোন প্রোটিন না দিলেও, প্রোটিন তৈরিকারি জীনদের এরা নিয়ন্ত্রন করে। এর থেকে আরো জানা গেল, মানুষের প্রায় ৮০% জীনই কোন না কোন কাজ করে এবং এই জীনের কোন পরিবর্তন ঘটলে বিভিন্ন বংশগতিক রোগ সৃষ্টি হতে পারে।  এই জাঙ্ক ডিএনএর পরিমান প্রানীভেদে ভিন্ন, যেমন মানুষের ৯৮% ডিএনএ জাঙ্ক আবার Utricularia gibba নামক উদ্ভিদে মাত্র ৩% ডিএনএ জাঙ্ক। তবে প্রকৃতকোষ থেকে আদিকোষে জাঙ্ক ডিএনএর পরিমান তুলনামূলক কম এবং সেটার পরিমান গড়ে ২০%।

সবথেকে মজার ব্যাপার হলো, এই জাঙ্ক ডিএনএ গুলো বিবর্তনের ধারায় প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। তারমানে দুই বা ততোধিক প্রানীর ডিএনএ পাশাপাশি রাখলে দেখা যাবে এই জাঙ্ক ডিএনএ’র জায়গা গুলোতে ডিএনএ অনুক্রম (DNA Sequence) প্রায় একই অর্থাৎ বিবর্তনের দিক থেকে এরা সংরক্ষিত (Evolutionary Conserved)। তাই এটা বললে খুব একটা ভুল হয়না যে -একটা প্রাণীর কেমন দেখতে হবে তার জন্য এসব প্রোটিন তৈরিকারি জিনগুলো দায়ী; অন্যদিকে যেহেতু জাঙ্ক ডিএনএ গুলো প্রায় অবিকৃতভাবে সকল জীবে রয়ে গেছে তাই কোন জীবের মধ্যকার জাঙ্ক ডিএনএ তুলনা করে বলে দেওয়া যায় উক্ত জীবের বিবর্তনের ধারা। মোটকথা, একটা জীব থেকে আরেকটা জীবের দূরত্ব যত, তাদের জাঙ্ক ডিএনএ’র মধ্যে পার্থক্য তত বেশি। এই মূলনীতি প্রয়োগ করেই তো ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং (DNA Fingerprinting) এর মাধ্যমে আজকাল অপরাধী, বাবা, মা অথবা সন্তান সনাক্ত করা হয়।

যাহোক, এতক্ষনে অন্তত এটা পরিষ্কার যে জাঙ্ক ডিএনএ গুলো একেবারে অকর্মা নয়। এখন কথা হলো এদের কাজ মুলত কি!  এটা জানার আগে ডিএনএ থেকে প্রোটিন তৈরির রেসিপিটা একটু বোঝা দরকার। আসলে ডিএনএ থেকে হুট করে প্রোটিন তৈরি হয়না, ডিএনএ থেকে ট্রান্সক্রিপশন (Transcription )প্রক্রিয়ায় প্রথমে মেসেঞ্জার আরএনএ (Messenger RNA) তৈরি হয়, মেসেঞ্জার আরএনএ তে থাকা তথ্যানুযায়ী পরবর্তিতে ট্রান্সলেশন (Translation) প্রক্রিয়ায় প্রোটিন তৈরি হয়। এখন এই দুটি প্রক্রিয়ায় মধ্যে অনেকগুলো ধাপ আছে যা বিভিন্ন জৈবানু (Biomolecules) দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই বায়োমলিকিউলস গুলোর বেশির ভাগই জাঙ্ক ডিএনএ (Junk DNA)। যেমন, ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরস (Transcription Factors) যা ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে; আবার এই ফ্যাক্টর গুলো আবার দাঁড়িয়ে কাজ করতে পারেনা, তাই তাদের এরা প্রোমোটারের (Promoter) উপর বসে কাজ করে। এই প্রোমোটার এক প্রকার জাঙ্ক ডিএনএ। আবার অনেক সময় প্রোটিন তৈরির হার বাড়াতে এনহ্যান্সার (Enhancer) কাজ করে, যেটাও এক প্রকার জাঙ্ক ডিএনএ। এছাড়া মেসেঞ্জার আরএনএ থেকে যখন ট্রান্সলেশন প্রক্রিয়ায় প্রোটিন তৈরি হয় তখন অ্যামাইনো এসিড (Amino Acid) কাচামাল ধরে নিয়ে আসে ট্রান্সফার আরএনএ (Transfer RNA) যেটা মুলত জাঙ্ক ডিএনএ থেকে তৈরি এক প্রকার আরএনএ, এবং যে খাটিয়ায় বসে অ্যামাইনো এসিডের মালা গাথা হয় সেটাও এক প্রকার জাঙ্ক ডিএনএ যেটার নাম, রাইবোজোমাল আরএনএ (Ribosomal RNA)। এছাড়াও খুব গুরুত্বপুর্ন এক প্রকার জাঙ্ক ডিএনএ হলো টেলোমেয়ার (Telomeres)। টেলোমেয়ার মুলত প্রকৃতকোষ অবস্থিত সুত্রাকার ডিএনএ’র দুই প্রান্তে থাকা বাড়তি ডিএনএ, এর প্রধান কাজ ডিএনএ’র মুল অংশ যাতে কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নাহয়। সুতরাং জাঙ্ক ডিএনএ গুলো আসলে ততটা জাঙ্ক নয়।

তথ্যসুত্রঃ


https://en.wikipedia.org/wiki/Noncoding_DNA

Junk DNA — Not So Useless After All

http://www.scientificamerican.com/article/hidden-treasures-in-junk-dna/

http://bigganblog.com/?p=2222

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s