এক অপরাজেয় ক্ষুদে সৈনিকের গল্প

বর্তমান বিশ্বে সবথেকে মারাত্মক রোগের নাম এইডস (AIDS)। এইডস একপ্রকার ভাইরাস ঘটিত রোগ এবং এইচআইভি (Human Immunodeficiency Virus) নামক এক প্রকার ভাইরাসের কারনে এই রোগটি হয়। এই ভাইরাসটি এতই ধুরন্ধর যে এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর কোন বিজ্ঞানীই একে বাগে আনতে পারেনি। কিন্তু এর পেছনে কারণ কি! এর পেছনে সবথেকে বড় ফ্যাক্টর হল বিবর্তন (Evolution)। আসলে বিবর্তন আমাদের মত বড়সড় প্রাণীদের চোখের আড়ালে অতি ধীর গতিতে ঘটলেও, অণুজীব, বিশেষ করে ভাইরাসদের জগতে এটা হর-হামেশাই ঘটে থাকে। দিজ ইজ নট এ বিগ ডিল টু দেম!

এইচআইভি মূলত রেট্রোভাইরাস (Retrovirus) অর্থাৎ আরএনএ (RNA) ভাইরাস। এর জেনেটিক গঠন বেশ সরল, মোট ৯-১০ টি জিনের সমন্বয়ে গঠিত হলেও এর মুল কাঠামোর সাথে প্রধান তিনটি জিন জড়িত – গ্যাগ (gag), পল (pol), ইএনভি (env)। গ্যাগ জিন গ্লাইকোপ্রোটিন (Glycoproteins) তৈরি করে, পল জিন তৈরি করে রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ (Reverse transcriptase) এনজাইম, আর ইএনভি জিন তৈরি করে কোষের বাইরের খোলস (Envelope)।

চিত্রঃ এইচআইভি ভাইরাসের গঠন

এই ভাইরাসের গায়ে গ্লাইকোপ্রোটিনের তৈরি শুড় আছে যেগুলোকে জিপি-১২০, জিপি-৪১ ইত্যাদি বলে ডাকা হয়। এরা এতই বদ যে একেবারে শুরুতে এইচআইভি তার জিপি-১৪০ শুড়টাকে আমাদের কোষঝিল্লীর গায়ে লেগে থাকা সিডি-৪০ নামক হুকের সাথে বেধে নেয় তারপর কোষের অভ্যান্তরে প্রবেশ করে। কোষের ভেতরে প্রবেশের পর ক্যাপ্সিড (Capsid) আবরন ভেঙ্গে যায় ফলে এর ভেতরে থাকা এনজাইম এবং আরএনএ (RNA) বেরিয়ে পড়ে। অতঃপর রিভার্স-ট্রান্সক্রিপ্টেজ এঞ্জাইমের কারিশমায় একসুত্রক আরএনএ (RNA) দিসুত্রক ডিএনএতে (DNA) রুপান্তরিত হয়। এখন শুধু ডিএনএ তো আর এমনি এমনি প্রোটিন তৈরি করতে পারবেনা। প্রোটিন তৈরির জন্য চাই একটা গোটা সিস্টেম যেখানে একেরপর এক ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়া চলবে। এইচআইভি ভাইরাস তখন নিজের ডিএনএকে ইন্টিগ্রেজ নামক এনজাইমের সাহায্যে কোষের ক্রোমোজমে অবস্থিত ডিএনএর সাথে যুক্ত হয়। এরপর ভাইরাস ডিএনএটি দুইদিকে যেতে পারেঃ এক ডিএনএ টি ক্রোমোজমে অবস্থিত ডিএনএর সাথে ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়ায় প্রোটিন তৈরি করতে পারে অথবা সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে বহুদিন পর্যন্ত তারপর উপযুক্ত পরিবেশ পেলে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর ট্রান্সক্রিপশনের মাধম্যে তৈরি বিভিন্ন প্রোটিন মিলে আবার নতুন ভাইরাস গঠন করে এবং সর্বশেষ পর্যায়ে কোষ ভেঙ্গে তারা বের হয়ে আসে। অতঃপর নতুন কোষে আক্রমন করে।

চিত্রঃ এইচআইভি ভাইরাসের কোষ আক্রমন এবং বংশবিস্তার

আপাতঃদৃষ্টিতে সহজ সরল মনে হলেও এই ভাইরাসটি এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে। এইচআইভির নির্ভরযোগ্য প্রতিষেধক এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে চ্যালেঞ্জ। বেশ কিছু কারণ এর পেছনে জড়িতঃ এটি মূলত দেহের প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থাকেই আক্রমন করে যা কিনা ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে; এটি অনেকদিন পর্যন্ত সুপ্তাবস্থায় থেকে হটাত করে প্রকাশ হতে পারে; এছাড়া এইচআইভির অনেক গুলো ভ্যারিয়ান্ট আছে, এবং প্রত্যেকেই আবার প্রতিমুহুর্তে পরিবর্তন হচ্ছে (ওই যে বিবর্তনের কথা বলেছিলাম!) ইত্যাদি। তাই এখনো পর্যন্ত এইচআইভি অপরাজিত সৈনিক। তবে এতে দুঃখের কিছু নাই, প্রথম টাইফয়েডের ভ্যাক্সিন তৈরি করতে সময় লেগেছিল ১০৫ বছর, পোলিও ভ্যাক্সিন তৈরিতে লাগে ৪৭ বছর আর হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের ভ্যাক্সিনে লাগে মাত্র ১৬ বছর; এইচআইভি ভাইরাস ধরা পড়েছে ১৯৮০ সালের দিকে তাই এখনো হাল ছেড়ে দেওয়ার সময় আসেনি।

Advertisements

2 thoughts on “এক অপরাজেয় ক্ষুদে সৈনিকের গল্প

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s