পদার্থ কণা নাকি অভিন্ন স্ট্রিং!

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক জটিল ধাঁধাঁ, এই মহাবিশ্ব কি দিয়ে তৈরি! একটা সময় ছিল যখন মানুষ ভাবতো পৃথিবীর সবকিছু বোধহয় পানি দিয়ে তৈরি (থেলিস, ৬২৪-৫৪৭ খ্রিষ্টপুর্ব)। এরপর একটা সময় ভেবেছে মাটি, বাতাস, পানি আর আগুন দিয়েই সবকিছু গঠিত (এম্পিডোক্লিস, ৪৮৪-৪২৪ খ্রিষ্টপুর্ব)। কিন্তু দিন পাল্টেছে, এখন আমরা জানি পানি, বাতাস, আগুন বা মাটি কোনটাই আসলে মৌলিক কিছু নয় বরং বিভিন্ন পদার্থের মিশ্রন। এই পদার্থগুলো ভিন্ন হলেও এদের প্রত্যকের ভিতর একটা মিল আছে আর তাহলো প্রত্যকে পদার্থই পরমাণু নামক অতি ক্ষুদ্র কণার দ্বারা গঠিত (যদিও পদার্থ ভেদে পরমাণুর গঠন ভিন্ন)। তবে পরমাণুর ধারনাও একেবারে নতুন নয়; খ্রিষ্টের জন্মেরও বহু বছর আগে গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস (৪৬০-৩৭০ খ্রিষ্টপুর্ব) সর্বপ্রথম পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণার নাম দেন পরমাণু (Atom)। ডেমোক্রিটাসের পরমাণুবাদকে ১৮০০ সালের শুরুর দিকে পুর্ণরুপে সঙ্গায়িত করেন জন ডাল্টন, এজন্য তাকে পরমানুবাদের জনক (Dalton’s Atomic Theory) বলা হয়। এখন কথা হলো, পরমাণু কি মৌলিক? নাহ, মৌলিক কণা হলো পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক যাকে আর ভাঙ্গা যায়না। অর্থাৎ, কোন পদার্থকে ভেঙ্গে ছোটছোট টুকরা করতে থাকলে একটা সময় তাকে আর ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করা যাবেনা, পদার্থের সেই ক্ষুদ্রতম কণাই হলো মৌলিক পদার্থ। বর্তমান জ্ঞানের আলোয়, মৌলিক পদার্থের এই সঙ্গানুযায়ী পরমাণু মোটেই মৌলিক কিছু নয়। তথাপী আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে, বিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত পরমাণুকে মৌলিক পদার্থই ভাবা হতো। এই ভাবনায় ভাটা পড়ে ১৮৯৭ সালে, যখন জে.জে. থমসন (১৮৫৬-১৯৪০) পরমাণুর অভ্যন্তরে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন (e) নামক কণিকার আলামত পান; এখান থেকেই মুলত পরামানুর মৌলিকত্ব নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এই সন্দেহটাই সত্যি হয় ১৯০৯ সালে যখন রাদারফোর্ড (১৮৭১-১৯৩৭) তার জীবনের সবথেকে গুরুত্বপুর্ণ এক্সপেরিমেন্টটা করেন। তিনি অত্যন্ত পাতলা (০.০০০০৪ সেমি) সোনার পাতের (Gold Foil) উপর আলফা কণিকা (২টি প্রোটন ও ২টি নিউট্রনের সমষ্টি, অনেকটা হিলিয়াম পরমাণুর মত) নিক্ষেপ করেন এবং দেখতে পান প্রতি ২০,০০০ কণিকার মধ্যে একটা কণা সোনার পাত ভেদ না করে বরং ফিরে আসছে, এথেকে তিনি সিদ্ধান্ত টানেন যে নিশ্চয় পরামাণুর কেন্দ্রে পজিটিভ চার্জ যুক্ত ভারী কোন কণা/বস্তু আছে যাতে ধাক্কা খেয়ে কণাটি ফিরে আসছে; এবং পরমাণুর প্রায় সম্পুর্ন ভর এই কণায় কেন্দ্রীভুত এছাড়া পরমাণুর বাকি অংশ প্রায় ফাকা। পরমাণুর কেন্দ্রে অবস্থিত এই কণার নাম দেওয়া হয় নিউক্লিয়াস। এখান থেকে প্রমাণিত হয়ে গেলো পরমাণু আদতে মৌলিক কিছু নয়।

চিত্রঃ পরমাণুর গঠনের সর্বজনস্বীকৃত মডেল

পরবর্তিতে জানা গেল, পরমাণুর কেন্দ্রে থাকা নিউক্লিয়াসকে ঘিরে ইলেকট্রন কণাটি আবর্তন করে (কেন্দ্রের ধনাত্মক ও ইলেকট্রনের ঋণাত্মক চার্জ পরষ্পরকে আকর্ষন করে)। তখনো নিউক্লিয়াসের গঠন জানা যায়নি, অপেক্ষা করতে হলো ১৯৩২ সাল নাগাদ। এরপর ১৯১৯ সালে রাদারফোর্ডের নিউক্লিয়াসে ধনাত্মক চার্জযুক্ত (+) প্রোটন (p) এবং ১৯৩২ বিজ্ঞানী চ্যাডউইক (১৮৯১-১৯৭৪) নিউক্লিয়াসে চার্জবিহীন নিউট্রন (n) কণা খুজে পেলেন। তাহলে দেখা গেলো পরমাণুর কেন্দ্রে থাকা নিউক্লিয়াস একক কোন কনা নয় বরং প্রোটন ও নিউট্রনের দলা মাত্র। মোদ্দাকথা, ১৯৩০ সালের দিকে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে পরমাণু আদৌ কোন মৌলিক কণা নয়; এবং ১৯৩২ সালে প্রমানিত হয় পরমাণু পারতপক্ষে আরো ক্ষুদ্রকণা ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন দ্বারা গঠিত। আরো একটা ব্যাপার এখানে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, নির্দিষ্ট কোন পদার্থের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটন এবং তাকে ঘিরে আবর্তনরত ইলেক্ট্রনের সংখ্যা সমান, যেমন, কার্বন (C) পরামানুর নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটনের সংখ্যা ৬ আবার ইলেক্ট্রনের সংখ্যাও ৬; ফলে সমান সংখ্যক ধনাত্মক চার্জ (+) ও ঋনাত্মক চার্জ (-) পরষ্পরকে ধরে রাখে এবং পরমাণুর সুস্থির গঠন তৈরিতে অবদান রাখে। ঘটনার কিন্তু এখনো শেষ হয়নি।

বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করলো কিভাবে প্রোটন বা নিউট্রনকে ভাঙা যায় বা আদৌ ভাঙ্গা যায় কিনা! কণাত্বরণ যন্ত্রের উন্নতির ফলে প্রোটন ও নিউট্রনকে অতি উচ্চমাত্রার শক্তি দেওয়া হয় এবং পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সাথে উচ্চগতিতে সংঘর্ষ করানো হলো। বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখলো, এই সংঘর্ষের ফলে উৎপন্ন হয়েছে এদের থেকেও ক্ষুদ্র অনেক কনা। দেখা গেলো প্রোটন বা নিউট্রনও আদতে মৌলিক নয়, এদেরকেও ভাঙা সম্ভব। এদেরকে ভেঙে পাওয়া গেলো কোয়ার্ক। যেমন, ২টি আপ কোয়ার্ক (u) ও ১টি ডাউন কোয়ার্ক (d) মিলে গঠিত হয় প্রোটন (uud); এবং ২টি ডাউন (d) ও ১টি আপ কোয়ার্ক (u) মিলে একটা নিউট্রন (udd) গঠিত হয়। ইলেক্ট্রনকে অবশ্য ভাঙা সম্ভব হয়নি কারন ইলেকট্রন নিজেই একটা মৌলিক কণা এবং এদের বলা হয় লেপ্টন কণা। এসব কণিকা গুলো সহজে বোঝার এবং মনে রাখার জন্য কণা পদার্থবিদরা একটা তালিকা বা মডেল তৈরি করেন যেটাকে বলে স্টান্ডার্ড মডেল অফ পার্টিকেল।

পরমাণুর গভীরে হাতড়ানো

স্টান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের চেনাজানা সকল পদার্থ এবং শক্তি মাত্র দুই প্রকার কণা দ্বারা সৃষ্ট – ফার্মিয়ন (Fermion) এবং বোসন (Boson)।চেনা জানা সকল পদার্থই ফার্মিয়ন কণা দিয়ে তৈরি; অপরদিকে সকল প্রকার বলের (মহাকর্ষ, তড়িৎচুম্বক বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল এবং সবল নিউক্লীয় বল) উদ্ভব হয় বোসন কণার জন্য (আমাদের সত্যেন বোসের নামেই এই কণার নামকরন করা হয়!)। ফার্মিয়ন কণাগুলো আবার তিন জেনারেশনে বিভক্ত। তন্মধ্যে প্রথম জেনারেশনের কণাই কেবল মাত্র সুস্থির পদার্থ তৈরি করতে পারে। নিচে স্টান্ডার্ড মডেলের তালিকা দেওয়া আছে, সেটা দেখলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

যেসকল কণা এনরিকো ফার্মি (১৯০১-১৯৫৪) এবং পাউল ডিরাক (১৯০২-১৯৮৪) কতৃক প্রদত্ত ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান মেনে চলে তাদের ফার্মিয়ন কণা বলা হয়। ফার্মিয়ন কণা আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়, কোয়ার্ক ও লেপ্টন। কোয়ার্ক হলো ছয় প্রকার – আপ (Up), ডাউন (Down), চার্ম (Charm), স্ট্রেঞ্জ (Strange), টপ (Top) এবং বটম (Bottom)। অন্যদিকে লেপ্টনও ছয় প্রকার – ইলেক্ট্রন (Electron), ইলেকট্রন নিউট্রিনো (Electron Neutrino), মিউওন (Muon), মিউওন নিউট্রিনো (Muon Neutrino), টাউ (Tau) এবং টাউ নিউট্রিনো (Tau Neutrino)।  যাহোক, ছয় ধরনের কোয়ার্কের মধ্যে কেবলমাত্র আপ ও ডাউন কোয়ার্ক (u এবং d) এবং ছয় প্রকার লেপ্টন কণার শুধুমাত্র ইলেক্ট্রনই (e) পদার্থ তৈরিতে ভুমিকা রাখে। লবাকি কোয়ার্ক গুলো প্রচন্ড ভারী হওয়ায় ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশনে সৃষ্টি হওয়া মাত্রই ক্ষয়ে যায় এমনকি তাদের প্রতিকোয়ার্ক সঙ্গীর সাথে মিলিত হওয়ারও সময় পায়না। কি দুর্ভাগ্য তাইনা!

standard model

চিত্রঃ মৌলিক কণার তালিকা বা স্টান্ডার্ড মডেল

যেসকল কণা সত্যেন বোস (১৮৯৪-১৯৭৪) এবং আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫) কতৃক প্রদত্ত বোস-আইন্সটাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে তাদের বোসন কণা বলা হয়। বোসন কণা প্রধানত দুই প্রকারঃ গজ বোসন (Gauge Boson) এবং হিগস বোসন (Higgs Boson) । গজ বোসন বিভিন্ন প্রকার বলের জন্য দায়ী; অন্যদিকে হিগস বোসন কনা ভরের জন্য দায়ী। গজ বোসন ছয় প্রকারঃ গ্লুওন (Gluon), ফোটন (Photon), ডাব্লিউ (W±), জেড (Z); । এইসব কণার বাইরে গ্রাভিটন (Graviton) নামের আরো একটি হাইপোথেটিক্যাল গজ বোসন কণা আছে। মহাকর্ষ বলের জন্য গ্রাভিটন কণা দায়ী ভাবা হয় যদিও বিজ্ঞানীরা এখনো এধরনের কোন কণা খুজে পাননি।

  • গ্লুওন কণাঃ গ্লুওন কণা সবল নিউক্লীয় বলের জন্য দায়ী। এরা কোয়ার্ক গুলোর মধ্যে আকর্ষন সৃষ্টি করে এবং পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা প্রোটন ও নিউট্রনকে একত্রে বেধে রাখা। এদের বিশেষ ধরনের চার্জ আছে, যাকে বলে কালার চার্জ। এদের ভর বেশি হওয়ায় এদের গতি আলোর গতি থেকে বেশ কম।
  • ফোটন কণাঃ ফোটন তড়িৎচুম্বকীয় বলের (আকর্ষন এবং বিকর্ষন) জন্য দায়ী। এরা ভরহীন হওয়ায় অতিদ্রুতো গতিতে ছুটতে পারে। ফোটন নিজে চার্জ নিরপেক্ষ কিন্তু এরা বিভিন্ন চার্জযুক্ত কণার মধ্যকার মিথষ্ক্রিয়ার সাথে জড়িত। দৃশ্যমান আলো থেকে গামা রশ্মি পর্যন্ত সবই ফোটন সৃষ্ট।
  • ডাব্লিউ (+/-) এবং জেড কণাঃ ডাব্লিউ বোসন মুলত দুটি কণা নিয়ে গঠিত, W+ ও W-, এজন্য একে Zoo Particle বা চিড়িয়াখানা কণা বলে। এরা পরষ্পরের প্রতিকণা। W এবং Z বোসন দুর্বল বলের জন্য দায়ী। এরা লেপ্টন তথা ইলেকট্রন ও নিউট্রিনোর মধ্যকার মিথষ্ক্রিয়ায় জড়িত। পরমাণুর তেজষ্ক্রিয়তার জন্য এরা দায়ী, বিশেষ করে বিটা ক্ষয়ের জন্য। এরা ভারী হওয়ায় এদের গতি কম।
  • গ্রাভিটন কণাঃ গ্রাভিটন কণা এখনো পাওয়া যায়নি তবে ধারণা করা হয়, মহাকর্ষ বলের জন্য এরাই দায়ী। এদের চার্জ এবং ভর কোনটাই নেই। ভরহীন হওয়ার কারনে এদের গতি যেমন বেশি তেমনি এই বলের রেঞ্জ বা ব্যাপ্তি অনেক বেশিদুর হয়ে থাকে।

টিকাঃ অনেকের হয়তো মনে হতে পারে কেন কোয়ার্ক কণাকে ভেঙে দেখা হলোনা বা কোয়ার্ক কি দিয়ে তৈরি!? আসলে এখনো পর্যন্ত কোয়ার্ক ভাঙা সম্ভব হয়নি কারন প্রোটন বা নিউট্রনে কোয়ার্কের উপস্থিতির প্রমান পাওয়া গেলেও কোয়ার্ককে প্রোটন বা নিউট্রন থেকে আলাদা করা সম্ভব হয়নি। তাই কোয়ার্কের গঠন সম্পর্কে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে, এমনো হতে পারে, কোয়ার্কই মৌলিক কণা। আবার নাও হতে পারে! 😛 তবে স্টান্ডার্ড মডেল এখনো সম্পুর্ন নয় যদিও অনেক ক্ষেত্রেই খুব সফলতা দেখিয়েছে। যেমন, এই মহাবিশ্বের সবথেকে গুরুত্বপুর্ণ বল মহাকর্ষের জন্য দায়ী গ্রাভিটন কণা এখনো পাওয়া যায়নি।

হ্যাড্রন, ব্যারিয়ন, মেসন ও এক্সোটিক কণা

ব্যারিয়ন (Baryon) বা মেসন (Meson) মুলত যৌগিক কণিকা। উভয়ই তৈরি হয় কোয়ার্ক দিয়ে। তিনটি কোয়ার্ক অথবা তিনটি এন্টি-কোয়ার্ক মিলে তৈরি করে ব্যারিয়ন কণা, যেমন, প্রোটন (uud) বা নিউট্রন (udd) হলো ব্যারিয়ন কণা। আবার একটা কোয়ার্ক ও একটা প্রতিকোয়ার্ক মিলে তৈরি হয় মেসন কণা, যেমন, পাইয়ন (ud‾) যা মহাজাগতিক রশ্মিতে থাকে। তবে কোয়ার্করা ইচ্ছে করেলেই যেকোন সংখ্যায় এরকম মিলেমিশে থাকতে পারেনা, তাদের এই যুগলায়নের সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। এরা এমন ভাবে যৌগিক কণা গঠন করে যেন এদের সর্বমোট চার্জ -১, ০ অথবা +১ হয়। যেমন,  প্রোটনের (uud) গঠন = ২টি আপ কোয়ার্ক (uu) + ১টি ডাউন কোয়ার্ক (d)। এখন স্টান্ডার্ড মডেল থেকে আমরা, আপ কোয়ার্কের চার্জ পাই ২/৩ এবং ডাউন কোয়ার্কের চার্জ পাই –(১/৩)। সুতরাং প্রোটনের মোট চার্জ হবে, (২/৩+২/৩-১/৩) = +১। ঠিক একই ভাবে মেসন কণা পাইওনের গঠন = ১টি আপ কোয়ার্ক + ১টি প্রতি ডাউন কোয়ার্ক। তাহলে পাইওনের মোট চার্জ হবে, (২/৩+১/৩) = +১। এজন্য প্রকৃতিতে ৩টি আপ বা ৩টি ডাউন কোয়ার্কের মিলনে উৎপন্ন ব্যারিয়ন কণা পাওয়া যাবেনা, আবার ২টি ডাউন কোয়ার্ক বা ২টি প্রতি আপ কোয়ার্ক যুক্ত মেসন কণা পাওয়া যাবেনা।

চিত্রঃ ব্যারিয়ন, মেসন এবং হ্যাড্রন

যেসকল যৌগিক কণার মধ্যে কোয়ার্ক গুলো পরষ্পরকে সবল নিউক্লিয়ার বল দ্বারা ধরে রাখে তাদের হ্যাড্রন কণা বলে। এই অর্থে ব্যারিয়ন এবং মেসন উভয়ই হ্যাড্রন কণা (Hadron)। ব্যারিয়নরা ফার্মিয়ন কণা এবং মেসনরা বোসন কণার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও একধরনের কণার কথা ভাবা হয় যাদের ধর্ম প্রচলিত কণাদের থেকে সম্পুর্ন ভিন্ন, যেমন এদের ভর হবে ঋণাত্মক, আলোর থেকে বেশি গতিতে ছুটে বেড়াবে, চার্জধর্ম হবে বিপরীত অর্থাৎ সমধর্মী চার্জ পরষ্পরকে আকর্ষন করবে, আর বিপরীত চার্জ বিকর্ষন করবে ইত্যাদি, অর্থাৎ যাদের ধর্ম প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মের বিপরীত। এদের বলা হয় এক্সোটিক পদার্থ (Exotic Matter)। এসব কণাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে গাণিতিক আভাস পাওয়া গেলেও বাস্তবে তেমন কিছুই মেলেনি। এরকম একটা হাইপোথেটিক্যাল এক্সোটিক কণার নাম হলো টেকিয়ন (Tachyon) যার গতি আলোর থেকেও বেশি। ধারণা করা হচ্ছে গুপ্ত পদার্থ (Dark Matter) বা গুপ্ত শক্তি (Dark Energy) এধরনের কোন এক্সোটিক পদার্থ। ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি নিয়ে পরে বিস্তারিত লেখা হবে।

কণা ও প্রতিকণা – যুগলায়নে শক্তির স্ফুরন

এতক্ষন স্টান্ডার্ড মডেলের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন কণা সম্বন্ধে জানলাম। এখন জানবো কণাদের গার্ল ফ্রেন্ড তথা প্রতিকণা সম্পর্কে। খুব সহজ করে বললে, কণার বিপরীত কণাই প্রতিকণা। স্টান্ডার্ড মডেলের অন্তর্গত প্রতিটা ফার্মিয়ন কণারই একটা করে প্রতিকণা আছে, যারা সবদিক থেকে উক্ত কণার মত শুধুমাত্র বিপরীত আধান যুক্ত (Opposite Charge)। যেমন, ইলেক্ট্রনের প্রতিকণা পজিট্রন; এখানে ইলেক্ট্রনের চার্জ ঋণাত্মক এবং পজিট্রনের চার্জ ধনাত্মক। প্রতিটা কণার জন্যই একটা করে প্রতিকণা আছে। কণা দিয়ে যেমন তৈরি হয় পদার্থ; সেইরকম প্রতি কণা দিয়ে তৈরি হয় প্রতিপদার্থ। ফার্মিয়ন কণাদের প্রতিকণা থাকলেও বোসন কণাদের কোন প্রতিকণা নেই, তারা বড্ড একা।

চিত্রঃ কণা-প্রতিকণা সংঘর্ষ এবং উচ্চশক্তির বিকিরন

শুন্য থেকে কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের মাধ্যমে যখন পদার্থ বা কণার উদ্ভব ঘটে তখন কণা এবং প্রতিকণা যুগল আকারে উদ্ভুত হয়, এবং খুব দ্রুতই আবার নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ করে শক্তি উৎপন্ন করে শুন্যে মিলিয়ে যায়। কখনো কোন কণা একা উৎপন্ন হতে পারেনা, কারন এটা শক্তির সংরক্ষনশীলতা নীতি লংঘন করে। তাই কণা এবং প্রতিকণা সর্বদা একসাথে উৎপন্ন হয়। তাহলে প্রশ্ন হল, শুন্য থেকে পদার্থের উদ্ভবের সময় অবশ্যই সম পরিমাণ প্রতিপদার্থ তৈরি হয়ে থাকবে এবং শুন্যে মিলিয়ে যাওয়ার সময় পদার্থ-প্রতিপদার্থ দুটাই মিলিয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু আমরা এখন শুধু পদার্থ দেখি কেন! প্রতিপদার্থ না দেখার কারন কি! এর সঠিক কারন জানা না গেলেও, কি হয়েছিল সেটা অনেকটা আন্দাজ করা গেছে, আসলে বিলিয়ন বিলিয়ন কণার মধ্যে হয়তো অল্পকিছু কণা কোনভাবে টিকে যায়, সেগুলো থেকেই মুলত এই সবকিছুর সৃষ্টি। কিছু কণা টিকে যাওয়ার পেছনেও বেশ জোরালো কারন আছে।

পদার্থ কণা নাকি অভিন্ন স্ট্রিং এর ভিন্ন কম্পন!

পদার্থবিদ্যার প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণাদের আমরা মাত্রাহীন বিন্দুর মত মনে করি। স্ট্রিং থিওরি বলছে, দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার কারনে আমরা এদের কণা হিসাবে দেখলেও এইসব কণা আসলে মোটেই মাত্রাহীন বিন্দুর মত নয় বরং একমাত্রিক সুতার মত। এইতত্ত্ব মতে সকল মৌলিক কণিকাই আসলে এরকম তার বা স্ট্রিং। এসব তারের কম্পাংকের ভিন্নতার কারনেই ভিন্ন ভিন্ন মৌলিক কণা তৈরি হচ্ছে। তারের কম্পনের পার্থক্যই এদের চার্জ, ভর আলাদা করে দিচ্ছে। অর্থাৎ, স্টিং থিওরি মতে, মৌলিক কণিকা গুলো অভিন্ন স্ট্রিং এর ভিন্ন কম্পন। স্ট্রিং এর ভিন্ন কম্পনের কারনেই আমরা বিভিন্ন মৌলিক কণা পাচ্ছি। ঠিক যেমন গীটারের তারের কম্পাংকের পার্থক্যের কারনে মোটা ও চিকন সুর বের হয় ওরকম। এই তারের দৈর্ঘ্য খুবই ক্ষুদ্র, ১০-৩৩ অর্থাৎ প্লাঙ্ক দৈর্ঘ্যের সমান। এদের মুল কারিশমাই হলো কম্পন। যেমন, ইলেকট্রন বা কোয়ার্ক আলাদা কিছু নয় বরং দুটাই অভিন্ন স্ট্রিং। কিন্তু ইলেক্ট্রনের স্ট্রিং যেভাবে কাঁপছে, কোয়ার্কের স্ট্রিং হয়তো অন্যভাবে কাঁপছে, আবার নিউট্রিনোর স্ট্রিং কাঁপছে এদের থেকে আলাদাভাবে।

চিত্রঃ পদার্থ থেকে পরমাণু হয়ে স্ট্রিং পর্যন্ত সহজ উপস্থাপন

স্ট্রিং তত্ত্ব অনুযায়ী আমাদের এই পৃথিবী তিন বা চার মাত্রার নয় বরং দশ মাত্রার। তাহলে আমরা শুধু তিনটা মাত্রা দেখি কেন, বাকিরা কোথায়! আসলে বাকি মাত্রাগুলো এতই ক্ষুদ্র যে আমাদের দৃষ্টিসীমায় ধরা পড়ছেনা। স্ট্রিংগুলো অনেক ক্ষুদ্র হওয়ায় মাত্রাগুলো হয়তো ওইরকম ক্ষুদ্র জায়গার মধ্যে জড়িয়ে পেচিয়ে আছে। তবে মাত্রাগুলো তাদের ইচ্ছেমত জড়িয়ে-পেচিয়ে থাকতে পারেনা, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়। মাত্রাগুলো কালাবি ইয়ো ম্যানিফোল্ড (Calabi Yau Manifold) নামে বিশেষ গাণিতিক উপায়ে পেচিয়ে থাকে। স্ট্রিং তত্ত্বের ভাষায় মাত্রাদের এরুপ পেচিয়ে থাকাকে কম্প্যাক্টিফিকেশন (Compactifications) বলে।

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s