প্রকাশক হত্যা এবং আমার অবেলা!

দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাস্তান সৃষ্টির আয়োজন।  ব্লগার হত্যার ধারা বজায় রেখে এবার নতুন এক ধারার জন্ম দিতে কুপিয়ে জখম ও হত্যা করা হলো মুক্তধারার বইয়ের প্রকাশককে। গত ৩১ অক্টোবর, শুদ্ধস্বরের অফিসে হামলা করে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল, তারেক রহিম এবং রণদীপম বসু – এই তিন জনকে গুরুতর জখম করা হয়। এর ঠিক কয়েক ঘন্টা পরেই জাগৃত প্রকাশনীর ফয়সাল আরেফিন দীপন কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এদের চারজনের মধ্যে রণদীপম বসুর লেখার সাথে আমি পরিচিত। এই প্রকাশকদের অপরাধ তারা অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করেছিল। কি অদ্ভুত দেশ আমাদের! রক্ত দিয়ে এমন দেশ গড়েছি আমরা, যে দেশে ব্লগিং করা অপরাধ, কারো ব্লগিং প্রকাশ করা অপরাধ, হয়তো একদিন ব্লগ পড়াও অপরাধ হবে। শুধুমাত্র পড়ার জন্যই কুপিয়ে হত্যা করা হবে কোন ব্লগ পাঠককে; এবং পরম পুণ্যের এই কাজটি করবে ব্লগ দিয়ে ইন্টারনেট চালানো কিছু মাতাল।

এই পরম পুণ্যের ভাগীদার আমরাও বটে। এইযে এতোগুলা মানুষকে কুপিয়ে মারা হলো, আমরা কতজন তার প্রতিবাদ করেছি! কতজন রাস্তায় নেমেছি! প্রত্যেকেই ভাবছি, মরছে ব্লগার-প্রকাশক মরছে আমার তাতে কি! তাই আসেন বরং উল্লাস করি আর দোজাহানের অশেষ নেকি ভাগাভাগি করি, কি দরকার খামখা ঝামেলা বাধানোর! আজকাল মুক্তচিন্তা রাস্তায় কুচিকুচি হচ্ছে আর আমরা একটু গাইগুই করে মেনে নিচ্ছি, এটাই এখন নিরাপদ বাজী। দীপন ভাইয়ের বাবা ইতোমধ্যে বলে দিয়েছেন, তিনি বিচার চান না। বলবেন নাইবা কেন! এদেশে কি আদৌ কোন বিচার ব্যাবস্থা আছে! আমি হলেও সেটাই বলতাম। সেই ২০০৪ সালে হুমায়ুন আজাদ থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত এতোগুলো লেখক, ব্লগার, প্রকাশক খুন হলেন, এখনো কোন হত্যাই আলোর মুখ দেখেনি। অথচ এখানে প্রধানমন্ত্রীর নামে কেউ কটু কিছু লিখলেই দুই তিন ঘন্টার মধ্যেই ধরা পড়ে। আমি ব্লগার নই, লেখনী শক্তিও দুর্বল কিন্তু আমি অতি নগন্য পাঠক। তাই এদের মৃত্যু আমাকে পীড়া দেয়, ব্যাথিত করে। শুধুমাত্র লেখার জন্য হত্যা কি শান্তি প্রতিষ্ঠার নমুনা! স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য কুপিয়ে খুন কি অসাম্প্রদায়ীক কোন দেশ বা জাতির নির্দেশ করে! আমি একদমই তা ভাবিনা। আমরা ধীরে ধীরে অনুভূতিহীন, নিকৃষ্ট, নির্বাক এক বর্বর জাতিতে বিবর্তিত হচ্ছি, এবং সুযোগ করে দিচ্ছি কিছু মধ্যযুগীয় অদম্য শান্তির দূতকে।

আমি খুব ক্ষুদ্র মানুষ, এইসব মানুষদের ঋণ শোধ করার ক্ষমতা আমার নাই। এটুকু অন্তত বুঝি লেখালেখি করে আর যাইহোক এদেশে বিচার পাওয়া যাবেনা। একটু হাল্কা হওয়ার জন্য মনের খারাপ লাগাটা হয়তো ফেইসবুক বা কোন ব্লগে লিখে ফেলি কিন্তু আজকাল আমার গণ্ডিটা এতটাই ক্ষুদ্র হয়ে উঠেছে যে খারাপ লাগাটাও আর লেখা যাবেনা। আমি যেন দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছি। গতকাল বাবা বলে দিয়েছেন, আমাকে আর তিনি ছেলে মনে করেনা; আমাকে ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা করে; তিনি সাফ সাফ বলে দিয়েছেন আমি যেন তাকে আর বাবা বলে না ডাকি; তাকে কখনো ফোন না করি; আমার জন্য কোন টাকা পয়সা তিনি খরচ করবেন না। এটাও বলে দিয়েছেন, আমি যেন কখনো বাসায় না যাই। প্রশ্ন হলো, আমার অপরাধ কি!?

প্রকাশকদের উপর হামলা ও হত্যার নিন্দা করে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর “মিলিত মৃত্যু” কবিতাটি একটু বদলে আমি ফেইসবুকে একটা ছোট্ট স্টাটাস (মাইক্রোব্লগ) দিয়েছিলাম, বরং খুনী হও, তবু মস্তিষ্ক চালনা করোনা ।। বরং ধর্ষক হও, তবু অবিশ্বাসী হইওনা। এই একটা কথা বাবা-মা এবং আমার মধ্যে সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করলো। আমি লেখাপড়া শিখে নাকি অমানুষ বা জানোয়ার হয়ে গেছি। আদর্শ-নীতি-নৈতিকতা যে কবে থেকে জানোয়ারদের দখলে গেল বুঝতে পারিনি। সত্য কথা বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, রাজাকারদের বিরুদ্ধে বলা – এসব এখন জানোয়ারদের কাজ। উল্টোদিকে লেখাপড়া শিখে এখন তারাই মানুষ হচ্ছে – যারা আপাদমস্তক দেখতে মানুষের মত হলেও ধর্মের নামে মানুষ ঠকাচ্ছে, হত্যা-ধর্ষন করছে, প্রতারণা করছে, মিথ্যার বেশ্যাতি খুলে বসেছে, ঘুষ-দুর্নীতির দোলাচলে আঙুল ফুলিয়ে কলা গাছ বানাচ্ছে। দুঃখিত বাবা, আমি আমার শিক্ষার মাঝে এসব দর্শন খুজে পাইনি। তাই আমি তোমাদের মনের মত হতে পারিনি, আমি সত্যিই অনেক দুঃখিত!!!

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s