দ্বিধান্বিত বাঙালি জাতি ও যুদ্ধাপরাধী বিচার

জাতি হিসাবে বাঙালী আজীবন দ্বিধান্বিত। নিজের পরিচয় থেকে শুরু করে বিশ্বাস পর্যন্ত সবকিছুতেই তাদের দ্বিধা। দেশ ও জাতির জন্ম-ঊষালগ্ন তাদের চোখে ঘোলাটে। পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয় এদেশের সাধারণ জনগণ। রক্তের দামে কিনে নেয় বাংলাদেশ নামের এই ছোট্ট ভূখণ্ড। মাত্র ৪৪ বছর আগের কথা; অথচ কত সহজে ভুলে গেছে তারা। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমাদের আলাদা হওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল শোষণ মুক্ত সেক্যুলার দেশ গড়া কিন্তু এখন সেই লক্ষ্য বদলে হয়েছে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গড়া। এই বদল নিশ্চয় এমনি আসেনি, এসেছিল এদেশীয় কিছু পাকি জারজদের হাত ধরে। বাঙালী জাতি কখনো নির্বোধ ছিলনা কিন্তু তারা ছিল দ্বিধাবিভক্ত আর আবেগপ্রবণ। অস্ত্র হিসাবে এই দুটিই ব্যবহার করে ঐসব পাকি বীর্যরা। বাঙালীর আবেগকে তারা ধর্মের দিকে প্রবাহিত করে। বলাবাহুল্য, আজ তারা বেশ সফল।যেকারনে আজ খুন, হত্যা, ধর্ষন থেকেও ধর্মের অবমাননা এদেশে বড় অপরাধ। অবস্থা এমন জায়গায় পৌছেছে, এদেশে আল্লাহকে ব্যঙ্গ করলে কেউ ততটা নাখোশ নাহলেও মহানবীকে ব্যঙ্গ করলে মৃত্যু নিশ্চিত। আল্লাহ ও মহানবীর মধ্যে কে বড় সেটাই যে জাতি বুঝে উঠতে পারেনি তারা আবার কি ধর্ম করবে! এসব অনেক আগেই বুঝে গেছিল পাকি জারজগুলো, যাদের আজ ভদ্র ভাষায় আমরা যুদ্ধাপরাধী বলি। এদের মুল লক্ষ্যই ছিল পাকিস্তান বিমুখ বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানমুখী করা। দেশে এরা মাদ্রাসা ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েম করতে চায় অথচ এদের অনেকের ছেলে মেয়েরা সব বিদেশে আধুনিক শিক্ষায় আলোকিত (?) হচ্ছে! প্রকৃতপক্ষে ধর্ম এদের কাছে শুধু একটা ব্যবসা। যাহোক ধর্ম বিষয়ক কথা বন্ধ, ধর্ম নিয়ে কথা বলা মানেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া। আপাতত মৃত্যু নিয়ে পাঞ্জা লড়ার কোন মুড নাই।

এদেশের কিছু মানুষ এখনো মনে করে এখানে কেউ যুদ্ধাপরাধ করেনি তাই যুদ্ধাপরাধীও নাই। অর্থাৎ দ্বিধার পরিধি যুদ্ধাপরাধ পর্যন্ত পৌছে গেছে। পরিধির শেষ এখানেই নয়, অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়েও বিতর্ক করেন। এমনকি কাওকে এরকমও বলতে শুনেছি, মুক্তিযুদ্ধ কি সত্যিই হয়েছিল! ত্রিশ লক্ষ মানুষ কি শহীদ হয়েছিল, যদি হয়েও থাকে সেটা কে গুনেছিল কিভাবে গুনেছিল ইত্যাদি!? ভাগ্যিস বঙ্গবন্ধু বেচে নেই; নাহলে নিশ্চিত হার্টফেল করতো! অবশ্য যে জাতি তাকে জাতির জনক হিসাবে মেনে নিতে পারেনি তাদের কাছে এরকম কথা নিশ্চয় ততটা নিরাশার নয়। দ্বিধা এখানেও, কারন তাদের মগজে কিছু পোকা জাতির জনক ব্যাপারটা নিয়ে ত্যানা পেচিয়ে দিছে; এব্যাপারে পোকাদের মতামত “আমরা মুসলিম আর মুসলিম জাতির জনক ইব্রাহীম তাই অন্য কাওকে জাতির জনক হিসাবে স্বীকার করা আর দোজখের আগুনের ফুল্কি অনুভব করা এক কথা”। কিন্তু পোকাদের মগজে ঢুকবে কি করে যে ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে জাতি হিসাব করা হয়না; বরং জাতি ব্যপারটা অনেকাংশেই জড়িত ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে – সেই অর্থে আমরা বাঙালী জাতি এবং বাঙালী জাতির জনক হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সবথেকে মজার ব্যপার, এদেশীয় পোকার দল যাদের সাচ্চা মুসলমান ভাবে অর্থাৎ পাকিদেরও(পাকিস্তানী বললে সম্মানটা বেশী হয়ে যায়!) জাতির জনক আছে। পাকি বীজের জনক মুহম্মাদ আলী জিন্নাহ। একটা দেশের কোন ধর্ম হয়না তাই দেশের মানুষেরও প্রথম পরিচয় তারা কোন জাতি, তারা কি বিশ্বাস করে সেটা নয়। এজন্য আমাদের পরিচয় – আমরা বাংলাদেশী, আমরা বাঙালী।

দ্বিধা আমাদের স্বাধীনতার ঘোষক নিয়েও? এখানেও আমরা বঞ্চিত করি সেই মানুষটিকে যিনি আমাদেরকে এমন সুন্দর এক বাংলাদেশ দিয়েছেন, আবারো সেই বঙ্গবন্ধুকে। যেন বঙ্গবন্ধু পৃথিবীতে না এলেই তাদের কাছে সবকিছু চিরকল্যানকর মনে হতো। যাহোক, এদেশের বহুলোক এখনো মনে করে মেজর জিয়া ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক। কিন্তু আসলে কি তাই! তাহলে কেন আমরা ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস পালন করি! কেন ২৭শে মার্চ নয়? কারন ঐ দিনেই তো মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতার থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করেন। ভুল হয়েছে আসলে গোড়াতেই, ঐযে ঘোষক এবং পাঠক চিনতে ভুল। সত্যিকার অর্থে, তার অনেক আগেই ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রের সম্মুখেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন, তার সেই বিখ্যাত ভাষন “রক্ত যখন দিয়েছি আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো…” এটা অন্তত সবার জানা থাকা উচিৎ। এরপর ২৫শে মার্চের গনহত্যার পর ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে গ্রেফতার হওয়ার আগেই তিনি লিখিত ভাবে স্বাধীনতার ঘোষনা দেন এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেন সারাদেশে প্রচার করার জন্য। এইসময় অখ্যাত এক মেজর এই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন – সেই মেজর সাহেব হলেন মেজর জিয়া। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর পলাতক যুদ্ধাপরাধীরা দেশে ফিরে আসার পেছনেও ইনার সুনজর ছিল বলেই জানি।

যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রসঙ্গে অনেকেই ভ্রু-কুচকে বলেন, মুজিবতো সাধারন ক্ষমা করে দিয়েছিল তাহলে আবার বিচার কেন!? এটা ক্ষমতা দখল ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের একটা ষড়যন্ত্র মাত্র। যারা এগুলো বলেন তাদের জানা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, কারন বঙ্গবন্ধু সাধারন ক্ষমা করেছিলেন ঠিকই কিন্তু সেই ক্ষমা কাদের জন্য প্রযোজ্য ছিল সেটা ভালোভাবে জানা দরকার। এদেশে রাজাকারের সংখ্যা একেবারে কম ছিলনা, তবে তাদের সবার অপরাধ সমান ছিলনা – এরকম রাজাকারও ছিল যারা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাকিদের সংবাদ সরবরাহ করতো। বাবার কাছে শুনেছি, আমাদের এলাকায় যারা রাজাকার ছিল তারা গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে গরু, ছাগল, মুরগী নিয়ে যেত, পাকিদের খাবারের যোগান দিতে (আমাদের বাড়ি থেকেও তিনটা গরু নিয়ে যায়); এরথেকে বড় অপরাধ তারা করেনি সম্ভবত। বঙ্গবন্ধুর সাধারন ক্ষমা ছিল এধরনের রাজাকারদের জন্য যারা রাজাকার হলেও কোন মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে (খুন, হত্যা, ধর্ষন, লুন্ঠন, ঘরবাড়ি জ্বালানো ইত্যাদি) জড়িত ছিলনা। মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত ঘাতক দালাল বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে প্রণয়ন করা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন ১৯৭৩। ১৯৭৫ সালে ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ চালু করে এই বিচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য যে সেই আইনের অধীনেই বর্তমানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে।

যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে অনেকেই যুক্তি দেখান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের অনেকের (কাদের মোল্লা, সাঈদি বা কামরুজ্জামান) বয়স অনেক কম ছিল (প্রকৃতপক্ষে যা সত্য নয়); সুতরাং তাদের পক্ষে এসব করা সম্ভবই ছিলনা। আচ্ছা ধরেই নিলাম, তাদের বয়স কম ছিল, আচ্ছা কত কম ছিল! সাঈদির বয়স নাকি ১২-১৫ বছর ছিল (যদিও পরে সার্টিফিকেট থেকে জন্মসাল অনুযায়ী সাঈদি তখন ৩০-৩১ বছরের টগবগে জোয়ান)। কিন্তু ১৫ বছরের কম বয়সী কিশোররা যদি অস্ত্র হাতে পাকিদের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে পারে তাহলে তারা কেন খুন হত্যা ধর্ষন করতে পারবেনা, উপরন্তু যখন তাদের পাশে পাকিরা ছিল! এখন অনেকেই বলতে পারেন, যে ১৫ বছরের কম বয়েসীদের মুক্তিযুদ্ধে নেওয়া হতনা, এটা তাদের জানার ভুল। কারন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বয়সের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়নি। এক্ষেত্রে দুজনের নাম এই মুহুর্তে বলা যেতে পারে, যাদের বয়স ১৫ বছরের কম ছিল এবং যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল – আতিক রহমান (১৪) এবং আবু সালেক (১২)এরকম কম বয়সের আরো অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। এরপর বলা হলো, এই কাদের সেই কাদের না; এই সাঈদি সেই সাঈদি না; এই সাকা সেই সাকা না… এ গল্পের যেন শেষ নাই। আদালতে সম্পুর্ন দ্বিধাহীনভাবে প্রত্যক্ষদর্শীরা শনাক্ত করার পরেও তাদের দ্বিধা কাটছেনা। আমি ভাই এতো প্যাঁচগোচ বুঝিনা। সবথেকে বড়কথা হলো, এরা যদি তারাই নাহয় তাহলে পাকিদের এতো চুলকাচ্ছে কেন! পাকিরা এই বিচার বন্ধে এতো উদগ্রীব কেন! প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার থেকে বরং ভাবাটা বেশি প্রয়োজন।

সত্যি বলতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে পাকিরা সকল প্রকার চেস্টাই করেছিল, এবং মুক্তিযুদ্ধে যেমন এদেশের কিছু কুত্তা (রাজাকার) তাদের সাহায্য করেছিল; আজো তারা পাকি প্রেমে মশগুল। এদের দেখে মনেহয়, যদি আগামীকাল সকালে উঠে দেখতো এদের জন্ম আসলে পাকিদের বীর্যে হয়েছিল, তাহলে অনেকবেশী গর্ব অনুভব করতো এবং আগের বাবাকে পাছায় লাথি মেরে বের করে দিত। সাকাকে নিয়ে চারপাশে সংশয়, কিন্তু সাকাকে নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ দেখিনা আমি, সে রাজাকার ছিল এটার প্রমাণ সে নিজেই; গুডহিলের কথা নাহয় বাদ থাকলো। যাহোক সকল সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে, গতকাল সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসী কার্যকর হইছে। ফাঁসী থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সাকা ও মুজাহিদ দুজনেই রাষ্ট্রপতির কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা আবেদন করেছিলো (মুজাহিদতো আরো একপা বাড়িয়ে, ২১শে আগস্টের মামলার দায়ে ফাঁসী পিছানোর ধান্ধাও করেছিল!); স্বভাবতই রাষ্ট্রপতি সেটা নাকচ করেন। মজার বিষয়, এই ক্ষমা চাওয়া নিয়েও দ্বিধায় পড়েছে বাঙালী। ক্ষমার আবেদনের কথা নাকি সাকা ও মুজাহিদ পরিবার জানেই না। তাদের দাবী সাকা ও মুজাহিদ নির্দোষ, সুতরাং তারা ক্ষমা চাইতে পারেন না। সাকার হুকার মতে তার বাবা বাংলার বাঘ, চট্টগ্রামের সিংহপুরুষ, “বাঘ কখনো মাথা নত করে না”; এটা সরকারের প্রহসনমূলক ষড়যন্ত্র (আচ্ছা এমনতো হতে পারে যে, সাকা বা মুজাহিদ পরিবারের কাছে নির্দোষ থাকতে ও দলের সুবিধাবঞ্চিত হওয়ার ভয়ে পরিবার বা দলকে এটা জানায়নি!)।  এদিকে সাকা নাকি তার ছেলে হুকারে বলেছে “৬ ফুট ২ ইঞ্চি তোমার বাবা, কারও কাছে মাথা নত করে না”। সাকা সবটুকু মিথ্যা বলেননি, তিনি ৬ ফুট ২ ইঞ্চি বটে তবে বাঘ নয়, ছয় ফুট দুই ইঞ্চির এক নরখাদক। সময় নেই জেগে ওঠো বাঙালী, দ্বিধান্বিত আর কতদিন, মুক্তিযুদ্ধকে বৃথা যেতে দিওনা।

লেখাটি মুক্তমনাতে প্রকাশিতঃ লেখাটি লিঙ্ক এখানে

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s