ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস ও স্বাধীন বাংলার গোড়াপত্তন

আজ আমরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে বাস করি, যার আলো-বাতাস বড্ড বেশি নির্মল – ভূখণ্ডটি বাংলাদেশ, আমাদের জন্মভূমি। পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে কম সময়ে সবথেকে বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে। তাই আমাদের স্বাধীনতা নিছক সংগ্রাম ছিলনা, এটা ছিল অধিকার আদায়ের আন্দোলন, আত্মমুক্তির সংগ্রাম, আত্মসম্মানের লড়াই। এবং বলাবাহুল্য এরজন্য মূল্যটাও আমাদের কম গুনতে হয়নি, ত্রিশ লক্ষেরও বেশি জীবন এবং আড়াই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের জলাঞ্জলি দিতে হয়েছিল শুধু এই মুক্ত বাতাসটুকু পেতে। আমাদের স্বাধীনতার রক্তাক্ত ইতিহাস নয় মাসের এবং এই দীর্ঘ সংগ্রামে নিষ্কলুষ রক্তের পাশাপাশি দরকার ছিল একটি সুযোগ্য নেতৃত্বের। যাদের ভরসায় বাংলাদেশ নামক শিশুটিকে জন্ম দিতে ঝাপিয়ে পড়েছিল লক্ষ-লক্ষ আবাল-বৃদ্ধা-বনিতা। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সফল পরিণতি তথা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের আনুষ্ঠানিক বীজ প্রোথিত হয়েছিল ১৭ই এপ্রিল ১৯৭১। কি হয়েছিল এই দিনে, কেন এতো বিশেষ এই দিনটি!?

কারণ, ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালির স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশের আগামীদিনের প্রত্যাশিত দিক-নির্দেশনা, সাংবিধানিক এবং যৌক্তিক অধিকার রক্ষার জন্য মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয় যা পরবর্তিতে স্বাধীনতা সংগ্রামকে ঠেলে দিয়েছিল অবিশ্বাস্য নিশ্চিত জয়ের দিকে। সেকারণেই প্রতিবছর ১৭ই এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস হিসাবে পালন করা হয়।

কেন মুজিবনগর, কেন অন্যকোথাও নয়!?
মুজিবনগর সরকার স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম কার্যকরী সরকার। কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহাকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে মুজিবনগর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। সেদিনই বৈদ্যনাথতলা কে মুজিবনগর নামকরণ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন মেহেরপুর মুক্ত এলাকা হওয়ার কারণে স্থানটিকে শপথগ্রহণের জন্যে বেছে নেওয়া হয়। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এইখানে আরো একবার বাঙালির ভাগ্য নির্ধারন হয়েছিল। সত্যিকার অর্থে বাঙালি জাতির পরাধীনতার ব্যাপ্তি ২শ বছরেরও বেশি, ১৯৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ নবাব সিরাজুদ্দৌলার পরাজয়ের সাথে সাথে বৃটিশ ও পাকিস্তানি হায়েনাদের শাসন-শোষণ-নির্যাতনকালের সূচনা হয় মুজিবনগর আম্রকানন থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দুরের পলাশীর প্রান্তরে। প্রকৃতির বিচার কি অদ্ভুত, বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতীক্ষার পর স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রত্যূষকালও নির্মিত হয় ঠিক একই জায়গায়, অজ পাড়াগাঁয়ে রচিত হয় আরেকটি ইতিহাস – বাঙালির পরিপুর্ন মুক্তির ইতিহাস।

মুজিবনগর সরকার গঠন কেন প্রয়োজন ছিল!
১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুষ জয়লাভের পরেও পাকিস্তানি শাসকচক্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়নি। এরপর ১৯৭১-এর মার্চে সারা বাংলায় শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাংলার স্বাধীনতার জন্য প্রস্ততি গ্রহণের আহ্বান জানান। ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করলে ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনী কতৃক গ্রেফতার হবার আগমূহুর্তে বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র হতে মেজর জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিক ভাবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ হতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মূলত এখান থেকেই বাংলাদেশ বহির্বিশ্বের কাছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র রূপে গণ্য হয়। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট ছিলনা, বাংলাদেশকে সহায়তা ও সমর্থন দেওয়ার জন্য বিশ্ববাসীর প্রয়োজন ছিল একটা সুনির্দিষ্ট অথোরিটি। অন্যদিকে ২৫শে মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার সময় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নেতা তাজউদ্দীন আহমদ নিজ বাসভবন থেকে পালিয়ে যান এবং তিনি ৩১শে মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পৌঁছান। সীমান্তে পৌছে মুক্তিফৌজ গঠনের ব্যপারে তাজউদ্দীন আহমদ সাহায্য চাইলে তৎকালীন বি,এস,এফ প্রধান তাকে বলেন ভারত সরকারের নির্দেশ ব্যাতিত মুক্তি সেনা ট্রেনিং এবং অস্ত্র প্রদান সম্ভব নয়। এরপর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগে ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক কালীন সময়ে তিনি উপলব্ধি করেন যে সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐ সরকারের দৃঢ় সমর্থন ছাড়া বিশ্বের কোন দেশই বাংলাদেশের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে না। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি রূপে নিজেকে তুলে ধরবেন। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠকের সূচনাতে তাজউদ্দীন জানান যে ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আক্রমণ করলে ২৬শে মার্চেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে সরকার গঠন করা হয়েছে। শেখ মুজিব সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং মুজিবের গ্রেফতার ছাড়া তখন পর্যন্ত দলের অন্যান্য প্রবীণ নেতাকর্মীর খবর অজানা থাকায় সমাবেত দলীয় প্রতিনিধিদের সাথে পরামর্শক্রমে দিল্লির উক্ত সভায় তাজউদ্দীন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রূপে তুলে ধরেন। ঐ বৈঠকে তাজউদ্দীন আহমদ ইন্দিরা গান্ধীর কাছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের জন্য অনুরোধ করেন। ইন্দিরা গান্ধী তাকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, উপযুক্ত সময়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হবে। অর্থাৎ, মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনতে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দিক-নির্দেশনা, সাংবিধানিক এবং যৌক্তিক অধিকার রক্ষার জন্য মুজিবনগর সরকার গঠন করা তৎকালীন সময়ে অপরিহার্য ছিল।

আনুষ্ঠানিকভাবে অস্থায়ী সরকার গঠন
ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক শেষে তিনি বাংলাদেশকে সর্বপ্রকার সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলে তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের এমএনএ এবং এমপিএ’দের সাথে কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তে অধিবেশন আহ্বান করেন। উক্ত অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা ও পাক হানাদার বাহিনীকে স্বদেশ ভূমি থেকে বিতাড়িত করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত এবং নির্দেশিত পথে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জনের জন্য এই সরকার গঠন করা হয়। এইজন্য ১০ই এপ্রিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষনা করা হয়, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ‘অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি’ এবং তাজউদ্দীন আহমদকে করা হয় প্রধানমন্ত্রী। এর পরদিন এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। এরপর ১৭ই এপ্রিল ১৯৭১ পূর্ব ঘোষনা মোতাবেক কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরে বৈদ্যনাথ তলার এক আমবাগানে মন্ত্রিপরিষদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। দেশি বিদেশি প্রায় ৫০ জন সাংবাদিকের উপস্থিতিতে বেলা ১১টায় শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। কোরান তেলাওয়াত ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয় এবং শুরুতেই বাংলাদেশকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ রূপে ঘোষনা করা হয়। এরপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি একে একে প্রধানমন্ত্রী ও তার তিন সহকর্মীকে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর নূতন রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে কর্নেল এমএজি ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদে কর্নেল আবদুর রবের নাম ঘোষণা করেন। এই অনুষ্ঠানে ১০ই এপ্রিল গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। এই ঘোষণাপত্র এর আগেও ১০ই এপ্রিল প্রচার করা হয় এবং এর কার্যকারিতা ঘোষণা করা হয় ২৬শে মার্চ ১৯৭১ থেকে। ঐ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই বক্তব্য পেশ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর ভাষনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন। ভাষণের শেষাংশে তিনি বলেন, বিশ্ববাসীর কাছে আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম, বিশ্বের আর কোন জাতি আমাদের চেয়ে স্বীকৃতির বেশি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোন জাতি আমাদের চাইতে কঠোরতর সংগ্রাম করেনি, অধিকতর ত্যাগ স্বীকার করেনি, জয় বাংলা। অর্থাৎ এর মধ্যদিয়েই প্রধানমন্ত্রী দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিশ্বের দেশসমূহের উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানানো হয় আর এভাবেই মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে একাত্তরের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সূচনা হয়েছিল।

মুজিবনগর সরকার যেভাবে স্বাধীনতা প্রাপ্তিকে ত্বরান্বিত করেছিল!
মূলত যুদ্ধ পরিচালনা ও বিজয়লাভ এবং বহিঃবিশ্বের কাছে আমাদের স্বাধীনতার গুরুত্ব ও সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশের জনগণের প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মুক্তিবাহিনী সংগঠন ও সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় এবং এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী রাষ্ট্রভারতের সরকার ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক রক্ষায় এই সরকারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত সংসদের নেতৃত্বে একটি সাংবিধানিক সরকার বিশ্ব সভায় আত্মপ্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ভারত, তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুগোস্লাভিয়া, কিউবা, রোমানিয়া, পোল্যান্ডসহ পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নৈতিক সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করে। এভাবেই মুজিবনগর সরকার গঠন স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামরত বাঙালিদের প্রতি বিশ্ববাসী সমর্থন ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত হওয়া সহ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিজয় অর্জন ত্বরান্বিত করে।

বস্তুত, ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজবনগরের আম্রকাননে রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের জন্মের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি প্রস্তর। এখান থেকেই কার্যত শুরু হয় আত্মমুক্তির জন্য ছুটে চলা। বাংলাকে শত্রুমুক্ত করার প্রত্যয়ের ঊষালগ্নে তাই বাংলা, বাঙালি, মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর মিলেমিশে হয়ে যায় একাকার। শতবছরের ঐতিহ্য, বিবর্তন ও সংগ্রাম নিয়ে টিকে থাকুক বাংলা ও বাঙালিত্ব। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

Advertisements

মন্তব্য করুন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s